আইনসভার কার্যাবলি আলোচনা কর।

অথবা, আইন বিভাগের কার্যাবলি আলোচনা কর।

অথবা, আইন বিভাগের ভূমিকা আলোচনা কর।

উত্তরঃ ভূমিকা: বিভিন্ন দেশের আইনসভা বিভিন্ন কার্যাবলি সম্পাদন করে। সরকার একনায়কতান্ত্রিক হলে দেশে আইনসভার কোন গুরুত্ব থাকে না। আইনসভা একনায়কের হাতের পুতুলে পরিণত হয়। হিটলারের শাসনামলে আইনসভার কার্যাবলির বিভিন্নতা পার্লামেন্টারিতে যে ক্ষমতা থাকে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে তা থাকে না। ব্রিটেনের পার্লামেন্টের যত ক্ষমতা আছে আমেরিকার কংগ্রেসের ব্যবস্থায় তা নেই। কমন্সসভা প্রণীত কোন আইনকে বাতিল করার ক্ষমতা সে দেশের কোন বিভাগের নেই, কিন্তু কংগ্রেস প্রণীত আইন আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ বলে ঘোষণা করতে পারে, যদি তা শাসনতন্ত্রের ধারার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হয়। সরকারের সংগঠন ও প্রকৃতির বিভিন্নতার কারণে কাজেরও বিভিন্নতা দেখা যায়। তবুও সকল আইনসভাই কিছু কিছু কাজ করে যা সাধারণত একই প্রকার।

আইনসভার কার্যাবলি: নিম্নে আইনসভার কার্যাবলি আলোচনা করা হল:

১. আইন প্রণয়ন: আইন প্রণয়ন সর্বপ্রধান কাজ। অন্যবিধ কাজও করে, তবে আইন প্রণয়ন ব্যতিরেকে এর কোন গুরুত্ব নেই। এ বিভাগ আইন প্রণয়ন, সংশোধন ও পরিবর্তন করার মূল মালিক। আইনের বহু উৎস থাকলেও আইনসভাই প্রধান উৎস। সকল উৎস থেকে প্রাপ্ত আইন আইনসভা কর্তৃক স্বীকৃত না হলে রাষ্ট্রে প্রচলিত হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনে কেবলমাত্র নিম্নকক্ষ হিসেবে যথাক্রমে প্রতিনিধি সভা এবং কমন্সসভা বিল উত্থাপন করতে পারে। সুইজারল্যান্ডে কিন্তু যে কোন কক্ষে বিল উত্থাপিত হতে পারে। আইনসভা, আইন প্রণয়ন, সংশোধন ও পরিবর্তনের প্রধান মাধ্যম হলেও দেশের সংবিধানের বহির্ভূত কিছু করতে পারে না। সংবিধানের আওতার মধ্যে থেকে আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে।

২. আলোচনামূলক: আইনসভার প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন করা; কিন্তু তা এত সহজ ব্যাপার নয়। এজন্য অনেক আলাপ আলোচনা প্রয়োজন। আইন প্রণয়নের পূর্বে বহু আলাপ আলোচনা করে থাকে। এ ধরনের আলোচনার বিশেষ তাৎপর্য আছে। আলোচনার মাধ্যমে সত্য জিনিস আবিষ্কৃত হয়। এজন্য জে, এস, মিল বলেছেন, “Discussion means discovery of truth.”

৩. শাসন সংক্রান্ত: আইন প্রণয়ন করা প্রধান হলেও শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ অপর একটি প্রধান কাজ। আইন ও শাসন বিভাগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আইনসভা কর্তৃক প্রণীত আইন অনুসারে শাসন বিভাগ দেশ শাসন করে। শাসন বিভাগ আইন বাস্তবে প্রয়োগে দেশ শাসন করে কিনা সে বিষয়ে দেখাশুনা করার অধিকার সকল দেশের আইনসভারই “আছে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় শাসন বিভাগের উপর নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করতে পারে। তার মধ্যে আলোচনা, প্রশ্নকরণ, বিতর্ককালে। উত্থাপিত প্রস্তাব, তদন্ত কমিশন গঠন ইত্যাদি প্রধান। এসব পদ্ধতিতে নির্বাহী বিভাগের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে। পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় শাসন বিভাগ সম্পূর্ণ দায়ী থাকে।

৪. বিচারমূলক: আইনসভা কিছু বিচারমূলক কাজ করে। নিজ সদস্যদের আচার আচরণের বিচার, আইনসভা কর্তৃক নির্বাচিত উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনীত গুরুতর অভিযোগের বিচার, নির্বাচন সংক্রান্ত বিরোধের বিচার ইত্যাদি এর বিচারমূলক কাজের অন্তর্গত। মার্কিন, যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির অপসারণকালে সিনেট আদালত হিসেবে কাজ করে। সিনেট অধিবেশনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অবশ্য অপসারণের জন্য প্রস্তাব প্রথমে প্রতিনিধি সভায় উত্থাপিত হয়। কিছু কিছু অঙ্গরাজ্যে বিচারকগণ জনসাধারণের দ্বারা নির্বাচিত হন।

৫. জনমত গঠন: গণতান্ত্রিক সরকার জনমতের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। জনমত গঠনে আইনসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আইন প্রণয়নকালে এর অভ্যন্তরে সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আইন প্রণয়নকালে এর অভ্যন্তরে সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা হয়। তাদের আলোচনার দ্বারা দেশের জনসাধারণ অনেক কিছু জানতে এবং তাতে নিজস্ব মতামতে স্থির হতে পারে। এতে একটি জনমত গঠিত হয়। এজন্য আইনসভা দেশের জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত। অধ্যাপক হ্যারবোল্ড বলেন, “আইনসভা সরকারের সেই বিভাগ যা জনসাধারণের কণ্ঠস্বর হিসেবে অত্যন্ত আন্তরিক হয়ে কাজ করবে বলে আশা করা যায়।”

৬. অর্থনৈতিক : গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের সকল সম্পদের মূল মালিক জনগণ। তাই দেশের আয়ব্যয়ের ক্ষেত্রে জনসাধারণের অংশীদারিত্ব রাখার জন্য আইনসভার সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। এর সিদ্ধান্ত ভিন্ন আয়ব্যয়ের কোন পরিকল্পনা করা যায় না এবং অনুমোদন ছাড়া সরকার আয়ের উৎস ও ব্যয়ের খাত নির্ধারণ করতে পারে না। নতুন খাতে করারোপ করতে গেলেও অনুমোদন আবশ্যক। যুদ্ধ ঘোষণা যদি অবশ্যম্ভাবী হয়, তাহলে আইনসভার অনুমোদন আবশ্যক। তাছাড়া অর্থের সংকুলান করা সম্ভব হয় না। বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণে অনুমোদন বিশেষ প্রয়োজন।

৭. সরকারি নীতি প্রণয়ন: সরকার কি করবে এবং নীতি কি হবে সে সম্পর্কে আইনসভায় সিদ্ধান্ত প্রণীত হয়। সরকারের কোন বিভাগের সাথে কোন বিভাগের কি সম্পর্ক থাকবে তা আইনসভাই নির্ধারণ করে দেয়। দেশে কোন বিশেষ আদর্শ ও মতবাদ প্রচলন করতে হলে পূর্বসম্মতি একান্ত আবশ্যক।

৮. অনুসন্ধানমূলক: সরকারের কার্যাবলির সঠিক তথ্য অবগত হওয়ার জন্য আইনসভা অনুসন্ধান কমিটি গঠন করতে পারে। কৃষি, শিল্প, ব্যবসায় বাণিজ্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক অশান্তি, শ্রমিক আন্দোলন ইত্যাদির ক্ষেত্রে বিভিন্ন কমিটি ও কমিশন গঠন করে সংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান করা হয়। কমিটি ও কমিশন কর্তৃক প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে আইনসভা সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটেনের রাজকীয় অনুসন্ধান কমিশনের (Royal commission of inquiry) নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়।

৯. পররাষ্ট্রীয়: পররাষ্ট্রীয় বা কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও সিদ্ধান্তের বেলায় প্রচুর নিয়ন্ত্রণ আছে। সিনেটের অনুমোদন
ছাড়া আমেরিকায় কোন সন্ধি বা চুক্তি সম্পাদন এবং কার্যকরী করা যায় না। বলা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ১৯২০ সালে জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষর দান করেন কিন্তু সিনেটের অনুমোদন না থাকায় তিনি তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, আইনসভা প্রত্যেক দেশেই বিশেষ করে গণতান্ত্রিক দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারের অন্যান্য বিভাগ থেকে এ বিভাগের গুরুত্ব অত্যধিক। কেননা দেশের মেরুদণ্ড হল আইন। যদিও বর্তমানে আইনসভার ক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে তথাপি আইনসভার গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না।