অথবা, আধুনিক যুগের উদ্ভব ও বিকাশ পটভূমি আলোকপাত কর।
অথবা, আধুনিক যুগের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা কর।
অথবা, আধুনিক যুগ কী? আধুনিক যুগের উদ্ভব ও বিকাশের উপর একটি নাতিদীর্ঘ রচনা লিখ।
অথবা, আধুনিক যুগের উৎপত্তি ও বিকাশের পটভূমি আলোচনা কর।
উত্তরঃ ভূমিকা: রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে আধুনিক যুগ বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মধ্যযুগের শেষার্ধে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক যুগের সূচনা হয়। এ সমাজ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনসহ জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসার লাভ করে। রাষ্ট্রচিন্তার সূচনায় আধুনিক যুগ মূলত ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা, জাতীয়তাবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা, যুক্তিবাদের প্রাধান্য, লোকায়তবাদ প্রভৃতি বিষয় প্রাধান্য পায়। তবে আধুনিক যুগের উদ্ভব ও বিকাশে যে দার্শনিকের অবদান অগ্রগণ্য তার মধ্যে ম্যাকিয়াভেলি অন্যতম। মধ্যযুগের সমাপ্তি ও নতুন যুগের সূচনা সম্পর্কে বার্কি (Berki) বলেন, “Nobody knows exactly when the middle ages ended and the new era
began; all answers would contain arbitrary element.”
আধুনিক যুগের উদ্ভব ও বিকাশ: মূলত মধ্যযুগের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগের আবির্ভাব হয়। নিম্নে আধুনিক যুগের উদ্ভব ও বিকাশ ধারা আলোচনা করা হলো:
১. মধ্যযুগের পরিসমাপ্তি: আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রসার ঘটার অন্যতম কারণ হল মধ্যযুগের অবসান। যেসব বিষয় মধ্যযুগকে সজীব ও আলোচনা মুখর করে রেখেছিল, সেগুলো এ যুগের শেষের দিক তাৎপর্য হারিয়ে ফেলে। পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে মানুষের মন অনেকটা যুক্তিবাদী হয়ে উঠে। প্রতিটি বিষয়কে সমালোচনার দৃষ্টি দিয়ে বিচার করতে তারা আগ্রহী হয়। যাবতীয় বৌদ্ধিক চিন্তাধারা নতুন রাস্তা ধরে অগ্রসর হতে থাকে। পণ্ডিতরা এ দৃষ্টিভঙ্গিকে মধ্যযুগের পরিসমাপ্তি ও আধুনিক যুগের সূচনা বলে অভিহিত করেছেন।
২. ইউরোপে চরম অসন্তোষের উদ্ভব: গির্জার সর্বময় কর্তৃত্ব নিয়ে চতুর্দশ শতাব্দীর শেষে সারা ইউরোপে প্রচণ্ড আন্দোলন গড়ে উঠে। এর জন্য গির্জা নিজেই দায়ী। কারণ মধ্যযুগের শেষের দিকে গির্জার মোহান্তরা ভোগবিলাসে নিজেদের ডুবিয়ে রাখতেন। এসব কাজে ছিল পোপের সমর্থন। তাছাড়া গির্জা অর্থের বিনিময়ে মুক্তিপত্র বিক্রি করতো। এসব কারণে গির্জার উপরে জনগণের আস্থা ক্রমশ কমতে শুরু করে দিয়েছিল। ঠিক এ সময় দেখা দিয়েছিল বিরাট বিভেদ (Great Schism)। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে রাজারা অনেকখানি ক্ষমতা সঞ্চয় করে ফেলেছিল এবং এ কারণে গির্জার কর্তৃত্ব তারা মানতে রাজি ছিল না। ১৪শ শতাব্দীর শেষে বিভেদ চরমাকার ধারণ করে এবং পোপসহ সমস্ত গির্জার ক্ষমতা জনসমক্ষে হ্রাস পায়।
৩. গির্জার সংস্কার আন্দোলন: মধ্যযুগের গির্জার এ অধঃপতন দেখে মার্সিলিও অনেক আগেই সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে আরও অনেকে এগিয়ে আসেন। তৎকালীন সময়ে জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল, The reform of the Church in head and members. ইংল্যান্ডের ওয়াইক্লিফ (Wycliffe) ও বোহেমিয়ার হুস (Hus) নামক দু’জন সংস্কারক এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। এ দু’জন সংস্কারক গির্জা বা খ্রিস্টধর্মের বিরুদ্ধে কোন আন্দোলনের কথা বলেন নি। এ পরিস্থিতিতে গির্জার সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠে।
৪. পরিষদীয় আন্দোলন: মার্সিলিও এবং উইলিয়াম গির্জার সংস্কার সাধনের নিমিত্তে পরিষদ (Council) গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং তাদের পরে ওয়াইক্লিফ ও হুস এ প্রস্তাব সমর্থন করে আন্দোলনের রূপ দেয় বলে এটিকে পরিষদীয় আন্দোলন (Councilor movement) বলা হয়। আন্দোলনকারীদের মূল বক্তব্য ছিল ভগবানের দৃষ্টিতে সকলে সমান এবং কেউ উচ্চ বা নীচ নয়। পোপ ও সাধারণ যাজকের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না। পরিষদ আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হলেও পরিষদ আন্দোলন একদিকে রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি ও জাতীয় রাষ্ট্রের সূচনা করতে অন্যদিকে জনগণের যুক্তিবাদিতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করতে বিশেষভাবে সহায়তা করেছিল। যা আধুনিক যুগ উদ্ভব ও বিকাশে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পরিষদ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয় এবং পরবর্তীতে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বিকাশ লাভ করে।