উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার কারণ আলোচনা কর।

অথবা, উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্র কেন ব্যথ হয় উল্লেখ কর।

অথবা, উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্রের সমস্যাবলি উল্লেখ কর।

উত্তরঃ ভূমিকা: মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন। কোন মানুষই চায় না সে অন্যের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকুক। কিন্তু যুগে যুগে মানুষের এ প্রকৃতিগত স্বাধীনতা রুদ্ধ হয়েছে। মানুষ নিজেই বুঝতে পারে কিভাবে চললে তার কল্যাণ হবে। তাই প্রত্যেকেই তার মতামতের প্রতিফলন চায়। এ ধারণায় উদ্বুদ্ধ হয়েই জনন্ম হয়েছে গণতন্ত্রের। একমাত্র গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বস্তরের মানুষের মতামত প্রতিফলিত হতে পারে। তাই বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্রই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থ হিসেবে স্বীকৃত।

উন্নয়নশীল দেশসমুহে গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার কারণসমূহ: গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপদাস করা খুব কঠিন কাজ। ততীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিভিন্ন সমস্যার কারণে গণতন্ত্র তার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। নিম্নে এল কারণসমূহ আলোচনা করা হল:

১. সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলের অভাব: গণতন্ত্রের সফলতার জন্য সুসংগঠিত ও শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব অপরিহার্য। কিন্তু অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে সুসংগঠিত দেশে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল না থাকায় গণতন্ত্র ব্যর্থ হচ্ছে।

২. উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব: গণতন্ত্র সফলতার পূর্বশর্ত হচ্ছে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব। কিন্তু অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতি অসৎ ও অযোগ্য নেতৃত্বের হাতে ন্যস্ত।

৩. উপযুক্ত শিক্ষা ও জ্ঞানের অভাব: গণতন্ত্র হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনব্যবস্থা। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে অধিকাংশ লোকই অশিক্ষিত ও অজ্ঞ থেকে যায়। ফলে তারা যোগ্য শাসক নির্বাচনে ব্যর্থ হয় এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

৪. অর্থনৈতিক সংকট: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অধিকাংশ জনগণ দারিদ্রদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। ফলে তারা নিজেদের অন্ন সংস্থানের কাজে ব্যস্ত থাকে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষণে তাদের কোন ভূমিকা থাকে না। এভাবে গণতন্ত্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

৫. রাজনৈতিক উদাসীনতা: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে শাসকরা গণতন্ত্রের আচরণে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেন।

৬. সামরিক হস্তক্ষেপ: অনেক দেশগুলোতে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার পথে অন্যতম বাধা হচ্ছে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতালিন্দা ও উচ্চাভিলাষ। গণতান্ত্রিক সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। ফলে গণতন্ত্রের পতন ঘটে।

৭. গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অভাব: উন্নয়নশীল দেশগুলো সুদীর্ঘকাল ধরে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে তাদের অভিজ্ঞতা লাভ সম্ভব হয় নি। ফলে গণতন্ত্র সম্বন্ধে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অভাবে গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়।

৮. সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের অভাব: সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে গণতন্ত্রে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় বলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব প্রতিনিধি পাঠাতে পারে না। ফলে জনগণের একটি অংশ সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হয়। এ অবস্থায় উন্নয়নশীল দেশে গণতন্ত্র সফল হতে পারে না।

৯. সদাজাগ্রত জনমতের অভাব: গণতন্ত্র সফলতার জন্য অপরিহার্য হল সুস্থ, সবল ও সদাজাগ্রত জনমত। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশসমূহে সদাজাগ্রত জনমতের অভাবে গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়।

১০. বৈদেশিক শক্তির প্রভাব : অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে বিভিন্ন বিদেশি শক্তি সাহায্যের নামে বিভিন্ন উপায়ে হস্তক্ষেপ করে থাকে। তাই এসব দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা বিদেশি শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে গণতন্ত্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতন্ত্র ব্যর্থতার জন্য উপযুক্ত কারণগুলো দায়ী। অর্থাৎ এসব দেশগুলোতে গণতন্ত্রের সফলতার শর্তসমূহ পূরণ করা এখনও সম্ভব হয় নি। উন্নয়নশীল দেশগুলো গণতন্ত্রের শর্তসমূহ পূরণ করতে উদ্যোগী হলে সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।