জনকল্যাণ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।

অথবা, কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধরন বর্ণনা কর।

উত্তর: ভূমিকা: জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র মূলত সেই রাষ্ট্র যে রাষ্ট্র জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ সাধন করে। অর্থাৎ জনগণের কল্যাণে নিবেদিত রাষ্ট্রই ডজনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র। জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র জনগণের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বলে এর কদর দিন দিন বেড়েই চলেছে। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়-“Todays states are not the state but it regards the orient philosopher and guide to the people.”

জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য: জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটা মৌলিক ধারণা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুস্থ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা ও জনকল্যাণের জন্য কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পরিধি দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্নে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো:

১. জনকল্যাণ সাধন: জনকল্যাণ করা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রথম কাজ। এটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রথম বৈশিষ্ট্য। এ রাষ্ট্র কল্যাণের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। এ রাষ্ট্র জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কল্যাণার্থে কাজ করে।

২. ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা: কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম পরিচয় হলো ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণ। রাষ্ট্র জনকল্যাণের স্বার্থে ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। এ রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বকীয়তা রক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথকে উন্মুক্ত করে।

৩. অধিকার সংরক্ষণ: অধিকার সংরক্ষণ জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অধিকার নাগরিক জীবনকে বিকশিত করে। T. H. Green বলেছেন, “Rights are the outer conditions essential for man’s inner development.”

৪. নিরাপত্তা বিধান: নাগরিক জীবনে নিরাপত্তার দ্বারা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র তার দায়িত্ব সম্পন্ন করে। রোগ, শোক, ক্ষুধা ও দারিদ্রদ্র্য দূরীকরণ এ রাষ্ট্রের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব।

৫. জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন: জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র উৎপাদন, বৃদ্ধি, দ্রব্যের মান উন্নয়ন, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও সুষ্ঠু বণ্টন ইত্যাদি ব্যবস্থা করে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে নাগরিকের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন।

৬. পরিকল্পনা প্রণয়ন: পরিকল্পনা প্রণয়ন করা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক কাজ। বিশেষ করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়নে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

৭. অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি: জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র সাম্যের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে দায়িত্ব পালন করে। এ রাষ্ট্র নাগরিকের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে।

৮. বৈষম্য দূরীকরণ: বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পুঁজিবাদের প্রভাব অপরিসীম। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় অধিকাংশ সম্পদ ধনীদের হাতে কুক্ষিগত হয়। এর ফলে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে ধনীদের উপর করারোপ করা হয় ও সংগৃহীত করের অর্থ দরিদ্রের কল্যাণে ব্যয় করা হয়।

৯. ন্যায় প্রতিষ্ঠা: ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কল্যাণমূলক রাষ্ট্র কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশে ন্যায়বিচারের অভাব রয়েছে। ন্যায়বিচার প্রসঙ্গে সিফেলাস বলেছেন, “Justice seems to lie in speaking the truth and paying one’s debt.”

১০. শিক্ষাবিস্তার: শিক্ষাবিস্তার কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের একটা বিশেষ কাজ। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী কুসংস্কারাচ্ছন্ন। অশিক্ষা ও অজ্ঞতার কবল থেকে জাতিকে মুক্ত করতে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিশেষ দায়িত্ব পালন করে থাকে।

১১. অপচয় রোধ: কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সমাজের অপচয় রোধ করা। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে সম্পদের অপচয় বেশি হয়। কিন্তু কল্যাণমূলক রাষ্ট্র সম্পদের অপচয় রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্পদের সুষম বণ্টন ও ব্যবহার নিশ্চিত করা।

১২. দুর্যোগ মোকাবিলা: দুর্যোগ মোকাবিলায় কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিশেষ ভূমিকা রাখছে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে প্রায়ই প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা বাহিনী বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কল্যাণের ক্ষেত্রে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিশেষভাবে যত্নশীল। বলা যায়, মানুষ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন তথা সুখী ও সমৃদ্ধশালী জীবন গড়ার নিমিত্তে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিশেষ ভূমিকা পালন করে। উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমেই এর পরিচয় ফুটে উঠে।