টমাস হবসের সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।

অথবা, টমাস হবুসের সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধর।

অথবা, টমাস হবুসের সার্বভৌম তত্ত্বের বিভিন্ন দিক আলোচনা কর।

অথবা, সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে হাসের মতবাদ পর্যালোচনা কর।

অথবা, টমাস হবসের সার্বভৌম তত্ত্বের কী কী বৈশিষ্ট্য রয়েছে? বিশদভাবে লিখ।

উত্তরঃ ভূমিকা: প্রখ্যাত ফরাসি দার্শনিক Bodin প্রায় পঞ্চাশ বছর পর যিনি সার্বভৌমিকতার নিরঙ্কুশ বাজা নিয়ে রাষ্ট্রচিন্তার জগতে প্রবেশ করেন, তিনি ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক Thomas Hobbes। আধুনিক দার্শনিকদের মধ্যে টমাস হবসই প্রথম, যিনি রাজনৈতিক তত্ত্ব বিশ্লেষণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন। সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক গোলযোগের সময় তিনি ধর্ম ও প্রথাগত বিধান কোনটির পক্ষাবলম্বন না করে শুধু মানব প্রকৃতির পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি সর্বোচ্চ ক্ষমতার। আর এ সর্বোচ্চ ক্ষমতাই হচ্ছে হবস প্রণীর আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রদর্শনের রূপরেখা প্রণয়ন করেন। বস্তুত ইংল্যান্ডের সমকালীন রাজনৈতিক অরাজকতাপূর্ণ সার্বভৌম তত্ত্ব। সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে হয়সের মতবাদ আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবদাদ। আর এ আলোচনায় টমাস হস্যের সার্বভৌম তত্ত্ব এবং এ প্রসঙ্গে সার্বভৌমিকতার সাথে বাক্তির সম্পর্ক বিষয়ে হরসের অভিমত ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

টমাস হবুসের সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহ: টমাস হবসের ব্যক্তি ও সার্বভৌমত্বের সম্পর্ক আলোচনায় কতকগুলো বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। যথা:

১. সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ সকল শর্তের উর্ধ্বে: মানুষ নিজেদের মধ্যে তাদের যাবতীয় ক্ষমতা সার্বভৌমের কাছে হস্তান্তর করেছে। এজন্য সার্বভৌম চুক্তির কোন পক্ষ নয়, তিনি চুক্তির বাইরে অবস্থান করেন। তার ক্ষমতা চুক্তির কেম। শর্ত দ্বারা সীমিত নয়। ফলে তিনি সার্বভৌম চরম ক্ষমতার অধিকারী হবেন। এ চুক্তি সকল শর্তের উর্ধ্বে হওয়ার কারণে রাজা কোনভাবেই জনগণের নিকট দায়ী থাকবেন না।

২. সার্বভৌম শক্তি সকল প্রকার নিয়ন্ত্রণমুক্ত: হবদের সার্বভৌম ক্ষমতা অপ্রতিহত ও অপ্রতিরোধ্য, নৈতিক, সামাজিক, প্রাকৃতিক, ঐশ্বরিক ইত্যাদি কোন প্রকার আইনই এ শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সুতরাং হবসের সার্বভৌম শক্তি সকল প্রকার নিয়ন্ত্রণমুক্ত।

৩. সার্বভৌমের ক্ষমতা চিরস্থায়ী: জনগণ নিজেদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে সার্বভৌমের যাবতীয় কাজতে তাদের নিজেদের কাজ বলে স্বীকার করে নিয়েছে। তাই সার্বভৌমের ক্ষমতা চিরস্থায়ী।

৪. সার্বভৌম আইন দ্বারা সীমিত নয়: ২বসের সার্বভৌম ক্ষমতা শাসনতান্ত্রিক। প্রাকৃতিক কোন আইন দ্বারাই সীমিড নয়। হবসের মতে, প্রাকৃতিক আইন কোন আইন নয়। কারণ একে কার্যে পরিণত করার কোন শক্তি নেই। তিনি বলেন, ঐশ্বরিক আইন মানা উচিত তবে এ সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সার্বভৌমের হাতে।

৫. সার্বভৌম নৈতিকতার উৎস: হবসের প্রকৃতির রাজ্যে ন্যায় অন্যায়ের মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। মানুষ নৈতিকতার বইরে ছিল এবং তাদের সম্পত্তির অধিকার ছিল না। ন্যায় ও সম্পত্তির অধিকারের ভিত্তিতে মানুষ সার্বভৌম সৃষ্টি করেছে।

৬. সার্বভৌম ক্ষমতা আইনের ব্যাখ্যাকারী: সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ মানবিক, ঐশ্বরিক, শাসনতান্ত্রিক কোন আইনে বাধা নন। এজন্য তিনিই সকল ক্ষমতার অধিকারী এবং আইনের ব্যাখ্যাদানকারী। সার্বভৌম ক্ষমতাই ন্যায় ও নৈতিকতা, অনৈতিকতা প্রভৃতির ব্যবধান করতে সক্ষম।

৭. সার্বভৌম সকল ক্ষমতার উৎস: রাষ্ট্রে সার্বভৌম সকল ক্ষমতার উৎস। রাষ্ট্রের খেতাব, সম্মান, পদমর্যাদার, সাবিদার হচ্ছে সার্বভৌম। রাষ্ট্রের সকল সামরিক, বেসামরিক যে কোন কর্মচারী নিযুক্ত করায় তিনিই ক্ষমতাবান। হবসের মতে, সার্বভৌমকে ন্যায়ের উৎস বলা হয়।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, হবসের সার্বভৌমত্বের ধারণাটি যতই সমালোচিত হোক না কেন, রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসে তা মোটেই নিরর্থক নয়। হবস তাঁর সার্বভৌমিকতার ধারণা সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কর্ণনা করেছেন। তাই তাঁর ধারণা আধুনিক কালের মাপকাঠিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জীবনের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সংহতি রক্ষার কথা বিবেচনা করে একজন চরম ক্ষমতাসম্পন্ন সার্বভৌম রাজাই ছিল সর্বেসর্বা। কিন্তু বর্তমান কালের পরিপ্রেক্ষিতে একথা বলা যায় যে, হরসের সার্বভৌমত্বের মতবাদ আধুনিক কালের ফ্যাসিবাদেরই নামান্তর।