অথবা, টমাস হবুসের সার্বভৌমত্ব মতবাদ ব্যাখ্যা কর।
অথবা, টমাস হবসের সার্বভৌম তত্ত্ব ব্যাখ্যা কর।
অথবা, টমাস হবসের সার্বভৌম তত্ত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।
অথবা, সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে হবসের মতবাদ লিখ।
উত্তরঃ ভূমিকা: আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে বিখ্যাত ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবস সর্বপ্রথম রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করান। ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক আকাশে যখন কালো মেঘের ঘনঘটা তখনই সেদেশে আবির্ভাব ঘটে মহান দার্শনিক টমাস হবূসের। ১৬৪২ হতে ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ, অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও আত্মঘাতী কলহ ইত্যাদি উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনার দর্শকস্বরূপ ছিলেন টমাস হবস। অধ্যাপক বারকি (Berki) বলেছেন, “One of the most alluring hero villains of our entire tradition.” মূলত হবস ইংল্যান্ডের তৎকালীন অবস্থা অবলোকন করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, সভ্য জীবনের প্রধানতম শর্ত হচ্ছে একটি শক্তিশালী ও চরম ক্ষমতাসম্পন্ন স্থায়ী সরকার। আর এজন্য তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘Leviathan’ গ্রন্থে চূড়ান্ত ও নিরভুশ ক্ষমতাসম্পন্ন পরাক্রমশালী রাজার একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন তাঁর চরম সার্বভৌম তত্ত্ব। যার জন্য হবসকে নিরভুশ ক্ষমতাবাদী হিসেবে অভিহিত করা হয়। অধ্যাপক হার্নশ বলেছেন, ইংল্যান্ডের তৎকালীন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিকে আয়ত্তে আনয়নের ক্ষেত্রে হবক্সের চূড়ান্ত ও চরম ক্ষমতাসম্পন্ন সার্বভৌমের প্রয়োজনীয়তা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টমাস হবুসের সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা: হবস তাঁর সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা দান করতে গিয়ে বলেছেন, ‘সার্বভৌম শাসক হচ্ছে সে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যার বা যাদের নিকট জনগণ ক্ষমতা অর্থাৎ যাবতীয় আবিষ্কার হস্তান্তর করেছে এবং নিজেদের সম্পূর্ণভাবে সার্বভৌম শাসকের কাছে সমর্পণ করেছে।” এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডার্নিং (Dunning) বলেছেন, “By the sovereign is meant that individual or assembly who, by the terms of the contract on which the commonwealth rests is authorised to win instead of every party to the contract for the end of a peaceful life.”
টমাস হবুসের সার্বভৌম তত্ত্ব: হবুসের সার্বভৌমত্বের ধারণা, তাঁর সামাজিক চুক্তি মতবাদ থেকে এসেছে। তাই সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে জানতে হলে হবস এর প্রাকৃতিক রাজ্য যা সামাজিক চুক্তি গঠনের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব গড়ে তোলে তা জানা প্রয়োজন। হবস প্রাকৃতিক রাজ্য বর্ণনায় প্রাকৃতিক রাজ্যের মানুষের প্রকৃতি সম্বন্ধে বলেছেন, “Human nature is nasty, brutish, solitary, poor and short.” প্রাকৃতিক পরিবেশের এ অবস্থা হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ শাসনব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। জনগণের মঙ্গলের জন্য এক শাসকের দ্বারা রাজ্য শাসনের এক নীতির প্রতি আগ্রহী হয় এবং সবার সম্মিলিত অধিকার শাসকের হাতে অর্পণ করে। এভাবে পারস্পরিক সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে সার্বভৌম সরকার গঠন করে। নিম্নে হবদের সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণিত হলোঃ ফ্যাতোকরীর
১. চুক্তির ফলে উদ্ভূত: প্রকৃতির রাজ্যের অসহনীয় অবস্থার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জনগণ নিজেদের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করে সার্বভৌমত্বের জন্ম দিয়েছে। চুক্তির শর্ত ছিল এরূপ আমি এক ব্যক্তি বা ব্যক্তি পরিষদকে আমাকে শাসন করার ভার দিয়ে অধিকার পরিহার করেছি এ শর্তে যে, তুমিও অনুরূপভাবে তোমার অধিকার পরিহার করে তোমাকে শাসন করার অধিকার তার হাতে অর্পণ কর।”
২. সার্বভৌম আইনের উর্ধ্বে: হবস মনে করতেন সার্বভৌমের আদেশই আইন (Law is the command of sovereign)। আর তাই সার্বভৌম শক্তি সকল আইনের উর্ধ্বে অবস্থান করে। তিনি সবরকম নিয়মনীতি বা বিধিবিধানের উর্ধ্বে থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। তাঁর ক্ষমতার পরিধি রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বত্র বিস্তৃত।
৩. সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী: হবসের মতানুসারে, সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম শক্তি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী। সার্বভৌম শক্তির সমকক্ষ কোন কর্তৃপক্ষ থাকতে পারে না। সার্বভৌম শক্তিকে অন্য কোন ঊর্ধ্বতন অথবা অধস্তন কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অর্থাৎ সার্বভৌম ক্ষমতা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমত
৪. সর্বপ্রকার নিয়ন্ত্রণ মুক্ত: সার্বভৌম শক্তি অপ্রতিরোধ্য প্রাকৃতিক আইন, ঐশ্বরিক, সামাজিক কিংবা নৈতিক আইনের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। সার্বভৌম শক্তি তাই সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত।
৫. চিরস্থায়ী: সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ স্বীয় ক্ষমতা কারও নিকট হস্তান্তর করে না এবং কারও নিকট দায়ী থাকে না। এটি অপ্রতিহতভাবে প্রয়োগযোগ্য ও চিরস্থায়ী।
৬. চুক্তি ভঙ্গ করতে পারে না: জনগণ যেহেতু চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের সমস্ত ক্ষমতা ও অধিকার। শর্তহীনভাবে সার্বভৌম ক্ষমতার কাছে অর্পণ করে এবং সার্বভৌম শক্তি যেহেতু চুক্তির কোন পক্ষ নয়, সেহেতু সার্বভৌম শক্তি চুক্তি ভঙ্গ বা চুক্তি ভঙ্গের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারবে না।মে ৩৪০৫। জাত্যায় মোনই কানীশার গড়ার ঠোঁজ সাধচীজ
৭. আদর্শ নীতির উপর ক্ষমতা: হবসের মতে, সার্বভৌম যদি মনে করে যে কোন আদর্শনীতি বা মতামত রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক হলে তা পর্যালোচনা করতে পারেন এবং প্রয়োজনবোধে তা বন্ধ করে দিতে পারেন। (hall)
৮. কর্মচারী নিয়োগ: রাষ্ট্রের সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা কেবল সার্বভৌমত্বের হাতে ন্যস্ত থাকে। তাছাড়া খেতাব, সম্মান ইত্যাদি সার্বভৌমিকতার একমাত্র উৎস।কাত
৯. জনগণের নিকট দায়ী সয়: সার্বভৌম শক্তি জনগণের নিকট দায়ী নয়। হবুসের চুক্তির শর্তানুযায়ী সার্বভৌম শক্তি চুক্তির উর্ধ্বে। এ চুক্তি অনুযায়ী শাসক শাসিতের নিকট হতে ক্ষমতা লাভ করলেও তিনি শাসিতের নিকট দায়ী নন।
১০. জনগণের ক্ষতি করতে পারে না: মানুষ নিজেদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে সার্বভৌম শক্তির সকল কাজকে নিজেদের কাজ বলে স্বীকার করে নিয়েছে। তাই সার্বভৌম শক্তি জনগণের কোন ক্ষতি করতে পারে না।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, যদিও সমালোচকগণ হবুসের চরম সার্বভৌম তত্ত্বের জন্য তাঁকে নিরচুশ ক্ষমতাবাদী হিসেবে অভিহিত করেছেন তথাপি একথা স্বীকার্য যে, হবসই হচ্ছেন প্রথম রাষ্ট্র দার্শনিক, যিনি সার্বভৌমত্বের একটা সুন্দর রূপদান করেছেন। সার্বভৌমত্বের সঠিক ধারণা এর পূর্বে পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করে নি। ম্যাকিয়াভেলি, বোডিন ও গ্রোসিয়াস সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে আলোচনা করলেও হবসই সর্বপ্রথম সার্বভৌমত্বকে তাঁর বৈশিষ্ট্যের আলোকে সঠিকভাবে তুলে ধরেছেন। এজন্য অধ্যাপক গেটেল (Gettell) বলেছেন, “No writer has taken a more extreme view, than Hobbes of the absolute nature of sovereignty.” সুতরাং হবসকে নিরভুশ ক্ষমতাবাদী বলে অভিহিত করা যায়।