অথবা, সংসদীয় মন্ত্রিপরিষদ শাসিত বা সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা শ্রেষ্ঠ কেন উল্লেখ কর।
উত্তরঃ ভূমিকা: সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার মধ্যে এমন কিছু উপাদান বা গুণাবলি রয়েছে যা অন্য কোন শাসনব্যবস্থার মধ্যে সহসা দেখা যায় না। তাই এ সরকার ব্যবস্থাকে সর্বোত্তম সরকার ব্যবস্থা বলা হয়ে থাকে।
মন্ত্রিপরিষদ শাসিত বা সংসদীয় সরকারের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ: যেসব উপাদান বা গুণাবলির জন্য মন্ত্রিপরিষদ শাসিত বা সংসদীয় সরকার শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার সেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হল:
১. আইন ও শাসন বিভাগের মধ্যে সুসম্পর্ক: সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় আইন ও শাসন বিভাগের মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠে। কেননা এতে মন্ত্রিগণ একাধারে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগের প্রধান এবং আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্য। উভয় বিভাগের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকায় কোন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় না। তাই একে উৎকৃষ্ট শাসনব্যবস্থা বলে অভিহিত করা হয়।
২. সুপরিবর্তনীয় শাসনব্যবস্থা: সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা অপেক্ষাকৃত অন্যান্য সরকার ব্যবস্থা থেকে সুপরিবর্তনীয়। পরিবর্তনশীলতা ও গতিশীলতা হল এ সরকারের অন্যতম গুণ যা অন্যান্য সরকার ব্যবস্থায় অনুপস্থিত। সহজে পরিবর্তন করা যায় বিধায় এ সংবিধান সময়ের সাথে খাপখাইয়ে চলতে সক্ষম হয়।
৩. সরকার স্বৈরাচারী হতে পারে না: সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় মন্ত্রিসভাকে তার যাবতীয় কার্যাবলির হিসাব আইনসভায় পেশ করতে হয়। মন্ত্রিগণ এককভাবে বা যৌথভাবে এ কার্যাবলির জন্য দায়ী থাকেন। আবার আইনসভার আস্থা হারালে মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। তাই এ সরকার স্বৈরাচারী হতে পারে না।
৪. গণতন্ত্রের স্বরূপ বজায় থাকে: সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভাই হল প্রকৃত শাসক। জনপ্রতিনিধি কর্তৃক সরকারি নীতিনির্ধারিত এবং শাসনকার্য পরিচালিত হয়। তারা প্রত্যক্ষভাবে আইনসভার নিকট এবং চূড়ান্তভাবে জনগণের নিকট দায়ী থাকেন। তাই এখানে গণতন্ত্রের স্বরূপ বজায় থাকে।
৫. সরকারের স্থায়িত্ব: সরকারের স্থায়িত্ব সংসদীয় সরকারের একটি অন্যতম প্রধান গুণ। স্থায়িত্ব নিয়ে সরকারকে ভাবতে হয় না। ফলে সরকার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করে থাকে। আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করে বলে সহজেই সরকার আইনসভার সক্রিয় সমর্থন লাভে সচেষ্ট হয়। তাই তারা স্থায়ী সরকারে পরিণত হয়।
৬. দায়িত্বশীলতা: সংসদীয় সরকার একটি দায়িত্বশীল সরকার ব্যবস্থা। এ সরকারের ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বশীল ও দায়িত্বশীল শাসনের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয়। মন্ত্রিসভা তার কাজের জন্য আইনসভার নিকট দায়ী থাকেন।
৭. জনগণের সার্বভৌমত্ব : অধ্যাপক জেনিসে বলেছেন, “সংসদীয় সরকার বলতে জনমতের দ্বারা গঠিত সরকারকেই বুঝায়।” অর্থাৎ এ সরকার ব্যবস্থায় জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিক। সরকার জনমত অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করে, নতুবা জনসমর্থন হারাবার ভয় থাকে।
৮. রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার: সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় নাগরিকদের রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটে। এ সরকার ব্যবস্থায় যে কোন সময় নির্বাচনের আশঙ্কা থাকে এবং ঘন ঘন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফলে সর্বদাই দলীয় প্রচারণা ও রাজনীতি চর্চা চলতে থাকে। এতে জনগণের রাজনৈতিক জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পায়।
৯. গঠনমূলক সমালোচনা সম্ভব: সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় বিরোধীদল ও সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করার সুযোগ পায়। ফলে সরকার তার ভুল সংশোধন করে সঠিক পথে পরিচালিত হতে সক্ষম হয়। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় বিরোধীদলের ভূমিকা তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ।
১০. অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের শাসন: মন্ত্রিসভার সদস্যরা যথেষ্ট রাজনৈতিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভের পরই মন্ত্রিসভায় স্থান লাভ করেন। এভাবে সুযোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রতিভাবান ব্যক্তিরাই দেশের নেতৃত্বদানে সুযোগ পান। ফলে দেশে অভিজ্ঞ
ব্যক্তিদের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
১১. বিপ্লবের সম্ভাবনা কম: সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় বিপ্লবের সম্ভাবনা কম থাকে। কারণ এখানে নির্দিষ্ট সময়ে সহজ উপায়ে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ থাকে।
১২. বাস্তবধর্মী আইন: সংসদীয় সরকার জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করে থাকে। কেননা তারা জনপ্রতিনিধি হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাই তাদের কর্তৃক প্রণীত আইন অনেকাংশেই বাস্তবধর্মী হয়ে থাকে।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, আর্দশের পরিপ্রেক্ষিতে এবং গুণগত উৎকর্ষ বিচারে সংসদীয় সরকার বা মন্ত্রিপরিষদ সরকারই শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা। বর্তমানে বিশ্বে তাই সব দেশেই সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান।