অথবা, ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয় কেন?
অথবা, ম্যাকিয়াভেলিকে কেন আধুনিক রাষ্ট্র দর্শনের জনক বলা হয়?
অথবা, ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলার যুক্তিসমূহ আলোচনা কর।
অথবা, ম্যাকিয়াভেলিকে প্রথম আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বলা হয় কেন।
অথবা, জ্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্র দর্শনের জনক বলার প্রধান কারণসমূহ কী কী?
অথবা, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে ম্যাকিয়াভেলির অবদান তুলে ধর।
উত্তরঃ ভূমিকা: মধ্যযুগের শেষের দিকে ও আধুনিক যুগের পূর্বে এক শুভ সন্ধিক্ষণে ১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে ম্যাকিয়াভেলি জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের স্বরাষ্ট্র ও দেশরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেক্রেটারি পদে অধিষ্ঠিত হন। রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটলে তাকে ১৫১২ সালে নির্বাসন দণ্ড দেয়া হয়। আর এ নির্বাসন কালেই তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Prince’ এবং ‘The Discourses’ রচনা করেন। এ গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যে The Prince’ গ্রন্থটি তুলনামূলকভাবে অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ম্যাকিয়াভেলি এতে যেসব সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করেছেন তা তিনি কোন দার্শনিক ঐতিহ্য বা ধর্মতত্ত্বের ভিত্তিতে করেন নি। এসব সিদ্ধান্ত মূলত সমকালীন অবস্থা ও ঐতিহাসিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গৃহীত হয়েছে। তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘The Prince’ গ্রন্থে ধর্ম ও নৈতিকতা সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছেন।
ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক চিন্তাবিদ বলার কারণ: ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাবিদ বলা হয়। নিম্নে কারণগুলো উল্লেখ করা হলো:
১. বাঙকনাদিতা: বাস্তববাদিতা হলো আধুনিক রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ম্যাকিয়াভেলির মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।
২. রাষ্ট্রের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা: ম্যাকিয়াভেলি সর্বপ্রথম রাষ্ট্রের বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করেন।
৩. কূটনীতি সম্পর্কে অবদান: সঠিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কোন নীতি গ্রহণ করা উৎকৃষ্ট। তাঁর এ বলিষ্ঠ বক্তব্যে তাকে কূটনীতির অঙ্গনে উজ্জ্বল করে রেখেছে।
৪. জাতীয়তাবাদের আধুনিক মতবাদ: আধুনিক কালে রাষ্ট্রে যে সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনীয়তা তা প্রথম ম্যাকিয়াভেলিই চিন্তা করেন।
৫. মধ্যযুগের ধারণা পরিবর্তন: মধ্যযুগের ঐশ্বরিক বিধিবিধানের প্রচলন ও গির্জার প্রভাব থেকে দূরে সরে তিনি বলিষ্ঠ কন্ঠে বলেছেন, পার্থিব প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধর্ম ও গির্জা হতে রাষ্ট্র পৃথক।
৬. নৈতিকতার ব্যাখ্যা: ম্যাকিয়াভেলি নৈতিকতার দু’টি মান নির্ধারণ করেছেন: (ক) সরকারি ও (খ) ব্যক্তিগত নৈতিকতা। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের কল্যাণে শাসক প্রতারণা বা প্রবঞ্চনার আশ্রয় নিতে পারেন কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তা পারেন না।
৭. রাজনীতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি: আরোহ পদ্ধতি হচ্ছে আধুনিক রাজনীতির ভিত্তি। তিনিই প্রথম এ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, ধর্ম ও নৈতিকতাকে রাজনীতি থেকে পৃথক করা ম্যাকিয়াভেলির পূর্বে অন্য কোন দার্শনিকের পক্ষে সম্ভব হয় নি। তিনি ইতালির সমকালীন রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর মতবাদ প্রদান করেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল শাসকের কৌশল সম্বন্ধে আলোচনা। ডানিং বলেছেন, ম্যাকিয়াভেলির ক্ষেত্র হলো রাজনীতি, রাষ্ট্রতত্ত্ব নয়। তাই তাঁকে সর্বকালের আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বলা হয়। তার মতবাদ বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে কূটনীতির মূলভিত্তি রূপে সমাদৃত হয়েছে।