অথবা, ম্যাকিয়াভেলির আবির্ভাবের প্রাকালে সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা আলোচনা কর।
অথবা, ম্যাকিয়াভেলির আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট লিখ।
উত্তরঃ ভূমিকা: পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ম্যাকিয়াভেলি নামটি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে পরিগণিত হয়। তিনি মধ্যযুগের শেষ এবং আধুনিক যুগের শুরু এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে ইতালিতে জন্মগ্রহণ করেন। যখন ইতালিতে চরম বিশৃঙ্খলা ও দুরবস্থা বিরাজ করছিল, তখন ম্যাকিয়াভেলি এ চরম দুরবস্থা নিরসনকল্পে তাঁর সুবিখ্যাত ‘The Prince’ গ্রন্থে বিভিন্ন মতবাদ বা তত্ত্ব তুলে ধরেন। যার জন্য তাকে ‘সময়ের যথার্থ সন্তান’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
ম্যাকিয়াভেলিকে সময়ের যথার্থ সন্তান হিসেবে অভিহিত করার কারণ জানতে হলে তাঁর সমকালীন পরিবেশ পরিস্থিতি ও তাঁর অবদান আলোচনা করা প্রয়োজন।
ম্যাকিয়াভেলির আবির্ভাবের প্রাকালে সমাজ চিত্র: নিম্নে ম্যাকিয়াভেলির আবির্ভাবের প্রাক্কালে সামাজিক ও রাজনেতিক চিত্র তুলে ধরা হলো:
১. রেনেসাঁর প্রভাব: রেনেসাঁ বা জাগরণ মানুষের চিন্তাধারার উপর বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে। জনগণ পারলৌকিক চিন্তা বাদ দিয়ে ইহলৌকিক ও জড়বস্তু বিষয়ে অধিক মাত্রায় উৎসাহী হয়ে পড়ে। মানুষ জড়বাদী সুখস্বাচ্ছন্দ্যকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে।
২. নতুন শ্রেণির আবির্ভাব: রেনেসাঁর প্রভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ব্যবসায় বাণিজ্যের বেশ উন্নতি হয়। ফলে এক ধরনের বণিক শ্রেণির সৃষ্টি হয়। এ বণিক শ্রেণি কর্তৃক ব্যবসায় থেকে মুনাফা ও পুঁজি গঠনের মাধ্যমে এক সময় বুর্জোয়া শ্রেণির সৃষ্টি হয়।
৩. দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসন: প্রশাসন দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ ছিল। সমগ্র ইউরোপের মধ্যে ইতালির প্রশাসন সর্বাপেক্ষা দুর্নীতিপরায়ণ ছিল বলে মনে করা হতো। নিষ্ঠুরতা, হত্যা ও শঠতা নিত্যদিনের সামাজিক প্রত্যয়। তিনি ক্ষমতা অর্জন, ক্ষমতা সংরক্ষণ ও ক্ষমতার বৃদ্ধি সাধনের পন্থা নির্দেশ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সুশৃঙ্খল উপায়ে ক্ষমতা গ্রহণ।
৪. চরম রাজতন্ত্রের উদ্ভব: মধ্যযুগে গির্জার নির্দেশ বা মত ছিল সর্বেসর্বা, কিন্তু যোড়শ শতাব্দীতে এর অবসান ঘটে। রাজনীতি পুরোপুরি বাজার কজায় এসে যায়। প্রয়োজনের তাগিদে রাজা অর্থনীতিকে নিজ আয়ত্তে আনেন। বণিক শ্রেণিও রাজার দলে ভিড়তে থাকে। এভাবে চরম রাজতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে।
৫. ইতালির বিভক্তি: রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইতালির অবস্থা চরম হতাশাজনক ছিল। ইতালি পাঁচটি বৃহৎ রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল- নেপলস, মিলান, ভেনিস, ফ্লোরেন্স, পোপের রাজ্য। এসব রাজ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ লেগে থাকতো।
৬. শাসনতন্ত্রের অবক্ষয়: মধ্যযুগের ব্যবসায় বাণিজ্যের প্রসারের ফলে বুর্জোয়া শ্রেণির আবির্ভাব এবং রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে শাসনতন্ত্রের পতন ঘটে।
৭. রাজনৈতিক কোন্দল: ইতালির রাষ্ট্রসমূহ বিচ্ছিন্ন থাকায় রাজনৈতিক কোন্দল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম আকার ধারণ করে। নিজেদের মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষ চলতে থাকে। অ্যালোনের মতে, “Everywhere existed governments
without supporting tradition or recognized moral authority.”
৮. জাতীয়তাবাদ: ষোড়শ শতাব্দীর রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো জাতীয়তাবাদ। ম্যাকিয়াভেলি জাতীয়তাবাদের দিশারি ছিলেন। তিনি ইতালির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো একত্রিত করতে চেষ্টা চালান।
৯. ধর্ম ও নৈতিকতার পৃথকীকরণ: ষোড়শ শতাব্দীর রাজনীতিতে ধর্ম ও নৈতিকতাকে পৃথকীকরণের প্রবণতা দেখা যায়। এক্ষেত্রে ম্যাকিয়াভেলির অবদান লক্ষ্য করা যায়। তিনি ধর্ম ও নৈতিকতাকে রাজনীতি থেকে পৃথক করেন।
১০. খ্রিস্টীয় ধর্মের বিলোপ: ষোড়শ শতাব্দীর রাজনীতিতে খ্রিস্টীয় ধর্মের বিলোপ করা হয়। মধ্যযুগে খ্রিস্টধর্মের
প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে ম্যাকিয়াভেলি গুরুত্বপূর্ণ অবদঢ়। রাখেন। তিনি রাষ্ট্র সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি ঘোষণা করেন, রাষ্ট্র একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান।
১১. ব্যবসায় বাণিজ্যের উন্নতি: মধ্যযুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রাজশক্তির সাথে যাজক শক্তির অবিরাম বিরোধ এবং ব্যবসায় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্থবিরতা। কিন্তু আধুনিক যুগের সূচনা লগ্নে তথা ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে ব্যবসায় বাণিজ্যের প্রসার লাভ করতে থাকে।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনের দৃষ্টিতে তাঁর অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তিনিই প্রথম রাষ্ট্রচিন্তাকে মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে আধুনিক আলোর জগতে নিয়ে আসেন। এমনকি রাষ্ট্র শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয় তার উদ্ভাবকও তিনিই। Prof. Sabine বলেছেন, “Machiavelli more than any other political thinker, created the meaning that has been attached to the state in modern political usage.” মোটকথা, তৎকালীন সময়ে ম্যাকিয়াভেলি যেসব তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন তার ভিত্তিতে তৎকালীন ইতালির দুরবস্থার অবসান ঘটে এবং আধুনিকতার সূচনা ঘটে। তাই ঐ সময়ে ম্যাকিয়াভেলির আগমনকে ‘সময়ের যথার্থ সন্তান’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।