ম্যাকিয়াভেলি গির্জার প্রভাব থেকে রাষ্ট্রকে কিভাবে পৃথক করেছেন? আলোচনা কর।

অথবা, ম্যাকিয়াভেলিবাদ ধর্ম বা গির্জা থেকে রাজনীতি আলাদা করে রাষ্ট্রব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন আলোচনা কর।

উত্তরঃ ভূমিকা: পঞ্চদশ শতাব্দীতে গির্জা ও রাষ্ট্রে সীমিত শাসন প্রবর্তনের ক্ষেত্রে পরিষদ আন্দোলনের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে মধ্যযুগের অবসান সূচিত হয়ে আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয়। রাষ্ট্রচিন্তার এ যুগসন্ধিক্ষণে সাধারণভাবে সমগ্র ইউরোপে এবং বিশেষভাবে ইতালিতে যে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন সাধিত হয় তার বাস্তব প্রতিফলন-আমরা দেখতে পাই ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রদর্শনে। রাজনীতিকে ধর্ম ও নৈতিকতা থেকে পৃথক করে নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি একে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞানে পরিণত করেন। মূলত মধ্যযুগে ধর্ম ও গির্জার প্রভাবে রাজনীতি যখন মুমূর্ষু অবস্থায় তখনই ম্যাকিয়াভেলি তাঁর বিখ্যাত ‘The Prince’ গ্রন্থে রাজনীতিকে এ দু’য়ের প্রভাব থেকে মুক্ত করার কথা উল্লেখ করেন।

ম্যাকিয়াভেলি যেভাবে গির্জার প্রভাব থেকে রাষ্ট্রকে পৃথক করেন: নিয়ে ম্যাকিয়াভেলি যেভাবে গির্জার প্রভাব থেকে রাষ্ট্রকে পৃথক করেছেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

১. নৈতিকতার দ্বৈত ভিত্তি: ম্যাকিয়াভেলি নৈতিকতার দ্বৈত মতবাদের কথা বলেছেন। তিনি শাসকের জন্য এক ধরনের মতবাদ এবং শাসিতের জন্য অন্য ধরনের মতবাদের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, শাসকের নৈতিকতার মাপকাঠি আর শাসিতের নৈতিকতার মাপকাঠি, সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। শাসক তার নিজস্ব নৈতিকতার ধারণা অনুযায়ী রাষ্ট্র শাসন করবেন। ব্যক্তির ক্ষেত্রে যা নীতিসম্মত শাসকের ক্ষেত্রে তা নাও হতে পারে।

২. ধর্মনিরপেক্ষবাদের ধারণা: ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্রকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্মের কোন ভূমিকা নেই। ম্যাকিয়াভেলি মনে করেন, ধর্ম মানুষকে পার্থিব জীবন সম্পর্কে উদাসীন করে তোলে এবং মানুষের কর্মপ্রেরণা নষ্ট করে নিস্পৃহ করে দেয়। কাজেই ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, শাসকরা ধর্ম ও নৈতিকতার দিকে নজর না দিয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থে যা প্রয়োজন তাই করবেন। কিন্তু ধর্ম ও নৈতিকতার সাহায্যে যদি কোন সমস্যার সমাধান করা যায় তবে তা উত্তম বলে তিনি মনে করেন।

৩. ধর্ম রাষ্ট্রের উর্ধ্বে নয়: ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন, গির্জা বা ধর্ম রাষ্ট্রের উর্ধ্বে নয়, বরং গির্জাই রাষ্ট্রের অধীন। ম্যাকিয়াভেলি তৎকালীন ইতালির অধিবাসীদের নৈতিক অধঃপতন দেখে বুঝতে পেরেছিলেন যে, ধর্ম ও নৈতিকতার পথ ধরে সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন করা সম্ভব নয়। তাই তিনি মধ্যযুগের ধর্মীয় বা গির্জার প্রভাবকে রাজনৈতিক প্রভাবে পরিণত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কেননা ধর্মীয় বিশ্বাসের আড়ালে থাকে কুসংস্কার, দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার। এজন্য তিনি গির্জাকে রাষ্ট্রের অধীনে আনয়ন করতে সচেষ্ট হন।

৪. সম্পতি হরণের ধারণা: ম্যাকিয়াভেলি তাঁর বিখ্যাত ‘The Prince’ গ্রন্থে বলেছেন যে, মানুষ তাঁর পিতার হত্যাকারীকে ক্ষমা করতে পারলেও, পিতার সম্পদ হরণকারীকে ক্ষমা করতে পারে না। বিজ্ঞ শাসক নিষ্ঠুরতা, হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি করলেও সম্পত্তি হরণ করবেন না। মূলত ধর্মের নামে গির্জার অপকর্মের কথা উল্লেখ করে ম্যাকিয়াভেলি এ কথা বলেন। ম্যাকিয়াভেলি কর্তৃক মানবপ্রকৃতির এরূপ ব্যাখ্যা হবসের রাজনৈতিক দর্শনেও বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল।

৫. চিন্তাধারার পদ্ধতি: ম্যাকিয়াভেলির চিন্তাধারা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তিনি বাস্তবতার কষ্টিপাথরে যাচাই করে তাঁর মতবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি তাত্ত্বিক দিকের চেয়ে রাষ্ট্রীয় ঐক্য, অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি বিষয়ের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি কেবল গির্জার ক্ষমতাকে পৃথক করেই ক্ষান্ত হন নি, গির্জাকে রাষ্ট্রের অধীনে আনয়নেরও চেষ্টা করেছেন। মূলত তিনি গির্জার প্রভাব থেকে রাষ্ট্রকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে দাঁড় করাতে সচেষ্ট হন।

৬. সাহসিকতা ও বিচক্ষণতা: জনগণ স্বভাবত খারাপ চরিত্রের অধিকারী। এ খারাপ মানুষগুলোকে বশে আনার জন্য তিনি শাসককে শিয়ালের মত ধূর্ত এবং সিংহের মতো সাহসী হতে বলেছেন। তাঁর মতে, ধর্ম ও রাজনীতি একসাথে চলতে পারে না। কারণ ধর্ম হলো আধ্যাত্মিক বিষয় আর রাজনীতি হলো বাস্তব বিষয়। তাই তিনি শাসককে বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার দ্বারা ধর্মকে, রাজনীতি থেকে পৃথক করতে বলেছেন।

৭. নিষ্ঠুর শাসক: ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, শাসকের নিষ্ঠুরতা যদি দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনে, তবে শাসক এ পন্থা অবলম্বন করতে পারেন। শাসক এজন্য জঘন্যতম নীতি অবলম্বন করলেও তা অন্যায় বলে বিবেচিত হবে না। কেননা রাষ্ট্রের সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে ধর্ম ও নৈতিকতাকে ত্যাগ করলে তা অন্যায়ের যোগ্য নয়। রাষ্ট্রের অভান্তরস্থ অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা কঠোর হস্তে দমন না করলে রাষ্ট্রের ঐক্য বিনষ্ট হবে। তাই গির্জার প্রভাব কোন রকমে রাষ্ট্রের উপর পড়তে দেয়া যাবে না।

৮. আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা: ম্যাকিয়াভেলি আধুনিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে গির্জার নিয়ন্ত্রণ থেকে রাজনীতি বা রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে সচেষ্ট হন। তিনি ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র স্থাপনে উদ্বুদ্ধ হন। ম্যাকিয়াভেলির মতে, “রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোন পার্থক্য থাকবে না। রাষ্ট্র হচ্ছে পার্থিব ব্যাপার আর ধর্ম হচ্ছে পারলৌকিক ব্যাপার।” ধর্ম সম্পর্কে তাঁর এ ধরনের মতবাদ তাকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেছে।

৯. উত্তম শাসকের বৈশিষ্ট্য: ম্যাকিয়াভেলি শাসককে ধর্ম ও নৈতিকতার উর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। তাঁর মতে, শাসকের সৎগুণ থাকুক আর না থাকুক, শাসককে এমন ভান করতে হবে, যাতে জনগণ তাকে একজন উত্তম শাসক বা সৎব্যক্তি বলে মনে করে। কেননা শাসক নীতিবান, ন্যায়পরায়ণ ও উদার হলেও মানুষের কূট স্বভাবের জন্য তার পক্ষে রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

১০. শাসক নৈতিকতার উর্ধ্বে: ম্যাকিয়াভেলির মতে, শাসক নৈতিকতার উর্ধ্বে। ব্যক্তি নৈতিকতার আনুগত্যে অটল থাকলেও শাসকের এমন কোন ধরাবাঁধা নিয়ম থাকবে না। শাসনের প্রয়োজনে শাসক নৈতিকতা গ্রহণ বা ত্যাগ করতে পারবে। ফলে শাসকের উপর গির্জার প্রভাব থাকবে না। তিনি যদি ধর্মের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধন করতে পারেন তবে সেটা ন্যায় বলে বিবেচিত হবে।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, ম্যাকিয়াভেলি মধ্যযুগের গির্জার প্রভাবকে বিলুপ্ত করে আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গির্জার প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে রাষ্ট্র কর্তৃক সামাজিক উন্নতির জন্য তিনি বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি রাষ্ট্রের কল্যাণ সাধনের জন্য শাসককে ধর্মের বাণী প্রচারের কথাও বলেছেন। যদিও ম্যাকিয়াভেলির দ্বৈত নৈতিকতার ও শাসকের অবাধ ও চরম ক্ষমতা সমালোচিত, তথাপি রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য এগুলো অপরিহার্য বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।