অথবা, রাজনীতিতে ম্যাকিয়াভেলির মতবাদ সম্পর্কে ব্যাখ্যা কর।
অথবা, রাজনীতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির চিন্তাধারা উল্লেখ কর।
উত্তরঃ ভূমিকা: ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রদর্শনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ধর্ম ও নৈতিকতা সম্পর্কে তার মনোভাব। ম্যাকিয়াভেলি ধর্ম ও নৈতিকতাকে রাজনীতি থেকে পৃথক করেছেন। নিম্নে রাজনীতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা বা মতবাদ আলোচনা করা হলো:
রাজনীতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা: ম্যাকিয়াভেলি হচ্ছেন সর্বপ্রথম আধুনিক চিন্তাবিদ। তিনি রাষ্ট্রদর্শনে এমন কতকগুলো নতুন নতুন ধারার সংযোগ করেন, যেগুলো আধুনিক ইউরোপে প্রচলিত কিন্তু মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রদর্শনে সম্পূর্ণ অপ্রচলিত ছিল। ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা। তিনি মনে করেন একমাত্র নিরদুশ ক্ষমতাধারী রাজাই রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করতে পারেন। রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি ও রাষ্ট্রকে সকল দিক থেকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলাই হবে রাজার একমাত্র কাজ। তিনি বলেছেন, রাজাকে একমাত্র রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রতি নজর রাখতে হবে। সে কারণে গৃহীত যে কোন ব্যবস্থাই সম্মানিত বলে বিবেচিত হবে এবং তা সবার সমর্থন লাভ করবে। ম্যাকিয়াভেলি নিরভুশ ক্ষমতাধারী রাজার কর্তব্য সম্পর্কে ‘The Prince’ গ্রন্থে কতকগুলো মূল্যবান উপদেশ প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, “A Prince should combine the qualities of a fox and a lion.” অর্থাৎ, নরপতিকে সিংহের ন্যায় তেজস্বী ও শৃগালের ন্যায় ধূর্ত হতে হবে। সাম্রাজ্য রক্ষাকল্পে শাসককে নীতিধর্ম বিসর্জন দিয়ে কঠোর, বেআইনি ও অন্যায় নীতির পথ প্রয়োজনে বেছে নিতে হবে।
ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই ক্ষমতালিন্দু, আক্রমণাত্মক, হিংসুটে, সঞ্চয়কামী ও স্বার্থপর। কাজেই শাসককে মানবপ্রকৃতির ধারণার উপর নির্ভর করেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে হবে। একথা তিনি অত্যন্ত জোরের সাথে বলেছেন, জীবন, সম্পত্তি ও নারী এ তিনটি জিনিস মানবপ্রকৃতির সর্বাপেক্ষা চিরন্তন কামনা। কাজেই শাসকের উক্ত তিনটি জিনিসের উপর হস্তক্ষেপ করা চলবে না।
সমালোচনা: ম্যাকিয়াভেলির রাজনীতি সম্পর্কিত মতবাদ নিম্নলিখিত সমালোচনার সম্মুখীন হয়:
১. তিনি রাজনীতি থেকে নৈতিকতাকে বিচ্ছিন্ন করেন। কিন্তু নৈতিকতা বিবর্জিত রাজনীতি সন্দিহান ও দুর্বোধ্য।
২. ন্যাকিয়াভেলি উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য শাসককে যে কোন পন্থা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন, যা আধুনিক
উগ্রজাতীয়তাবাদ তথা ফ্যাসিবাদী ধারণার জন্ম দেয়।
৩. তিনি মানুষ সম্পর্কে মন্তব্য করেন, স্বভাবতই মানুষ স্বার্থপর। কিন্তু এ মতবাদ পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. শুধু ছলচাতুরীর উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের শক্তি জনসম্মতির উপর নির্ভরশীল।
৫. তিনি একদিকে প্রচণ্ড শক্তিশালী শাসকের কথা বলেছেন অন্যদিকে প্রজাতন্ত্রের গুণগান করেন।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয়। তাঁর রাষ্ট্রদর্শনকে কোনভাবে ছোট করে দেখা যায় না। ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রদর্শেেনর উপরই বর্তমান অ্যান্তর্জাতিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত।