রাষ্ট্রচিন্তায় ম্যাকিয়াভেলির স্থান মূল্যায়ন কর।

অথবা, ম্যাকিয়াভেলিবাদ কী? রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ম্যাকিয়াভেলির অবদান আলোচনা কর।

অথবা , ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয় কেন?

অথবা, ম্যাকিয়াভেলিবাদ কী? ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয় কেন?

অথবা, ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয় কেন? আলোচনা কর।

অথবা, ম্যাকিয়াভেলিকে প্রথম আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বলা হয় কেন?

অথবা, আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনের ক্ষেত্রে ম্যাকিয়াভেলির অবদান মূল্যায়ন কর।

উত্তরঃ ভূমিকা: পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে যে কয়েকজন চিন্তাবিদ সমকালীন ঘটনাবলির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রাষ্ট্র সমন্ধে তাদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন তাদের মধ্যে ম্যাকিয়াভেলি অন্যতম। অভিজ্ঞতামূলক পদ্ধতি ও ইতিহাসকে অবলম্বন করে ম্যাকিয়াভেলি রাজনীতি বিশ্লেষণ করেছেন। রাজনীতি আলোচনা করাই ছিল তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য। রাষ্ট্রতত্ত্ব বা রাষ্ট্রদর্শন আলোচনা করা তাঁর কোন দিন লক্ষ্য ছিল না। সে জন্য তাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মর্যাদা দেয়া হয়। রাষ্ট্রচিন্তায় ম্যাকিয়াভেলির বিশেষ অবদান হলো তিনিই প্রথম ধর্ম ও নৈতিকতা থেকে রাজনীতিকে পৃথক করেন। আর তার এ গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলে আখ্যায়িত করা হয়।

ম্যাকিয়াভেলিবাদ: ম্যাকিয়াভেলি তাঁর বিখ্যাত ‘The Prince’ গ্রন্থে রাজপুত্রের কর্তব্য, মানুষের চরিত্র, রাষ্ট্রের প্রশাসন ও রাষ্ট্রের ঐক্য সাধন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রই হচ্ছে সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং তার উপর উচ্চতর কোন ক্ষমতা থাকতে পারে না। তিনি বিশ্বাস করেছেন যে, চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব, নিরাপত্তা ও সম্প্রসারণের জন্য যাকিছু অনুকূল তাই করতে পারে। এতে ধর্ম বা নৈতিকতা কোন প্রতিবন্ধবাতা সৃষ্টি করতে পারে না। তাঁর মতে, “শাসক রাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য প্রয়োজনবোধে নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে কঠোর, নির্মম, বেআইনি ও অন্যায়ের পথে অগ্রসর হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।”

ম্যাকিয়াভেলি তাঁর শাসককে ভালোবাসা, প্রেমপ্রীতি, দয়াদাক্ষিণ্য সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতারণা, কপটতা ও নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে মানুষের অস্তবে ভীতির উদ্রেক করার যে নীতি শিক্ষা দিয়েছেন এবং ধর্মকে ও নৈতিকতাকে নির্মমভাবে পদদলিত করার যে অবাধ স্বাধীনতা প্রদান করেছেন, তার জন্য তাঁকে ইতিহাসের অত্যন্ত নিষ্ঠুর রায়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে। রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে তাঁর নাম
‘ম্যাকিয়াভেলিবাদ’ (Machiavellism) নামে এক ঘৃণিত ও কুখ্যাত মতবাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। এ মতবাদের নিগলিত অর্থ হচ্ছে “শঠতা, কপটতা, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি ও বিমুখী নীতি।” রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ম্যাকিয়াভেলিবান একটি ঘৃণিত ও কুখ্যাত মতবাদ হিসেবে স্বীকৃত হলেও বর্তমান বিশ্বের আন্তর্জাতিক কূটনীতির এটিই হচ্ছে মূলভিত্তি।

রাষ্ট্রচিন্তায় ম্যাকিয়াভেলির অবদান: ম্যাকিয়াভেলির চরিত্র এবং তাঁর চিন্তাধারার সঠিক মূল্যায়ন আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এক বিস্ময়কর দিক। তাঁর রাষ্ট্রদর্শন উপলব্ধি করতে হলে ষোড়শ শতাব্দীর ইতালির সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করতে হবে। ম্যাকিয়াভেলি এমন এক সময় রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন যখন জনগণ নিজেদের স্বার্থরক্ষায় ব্যাপৃত ছিল। তাঁর চিন্তাচেতনায় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যা অন্য কোন রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে ছিল না, যার জন্য তাঁকে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয়। তাঁর রাষ্ট্রীয় দর্শন ও অবদান আলোচনা করলে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে তাঁকে কেন রাষ্ট্রচিন্তার জনক বলা হয়। নিম্নে তার রাষ্ট্রদর্শন ও অবদান আলোচনা করা হলো:

১. জাতীয়তাবাদী ধারণার প্রবর্তন: “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি।” দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসার প্রথম সার্থক বর্ণনা আমরা তার কাছ থেকে পেয়ে থাকি। তাঁর বিপন্ন স্বদেশ ইতালির প্রতি মমত্ববোধ প্রকাশের মাধ্যমেই তিনি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটান। ভি. ভি. রাও (V.V. Rao) বলেছেন, “Machiavelli, The frist conscious interprator of the idea of nation and of patriotism.”

২. রাষ্ট্র সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা: ম্যাকিয়াভেলিই প্রথম রাষ্ট্র সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা করেন। সমগ্র
মধ্যযুগব্যাগী রাষ্ট্রকে কল্পনা করা হতো একটি প্রাকৃতিক প্রতিষ্ঠানরূপে। শাসনকর্তা ছিলেন ঈশ্বরের নিকট দায়ী এবং আইনকানুন ছিল ঐশীবাণী। ম্যাকিয়াভেলিই প্রথম ঘোষণা দেন যে, রাষ্ট্রই হল একমাত্র মানবিক প্রতিষ্ঠান।

৩. কূটনীতি ও রণনীতি: ব্যক্তিগত জীবনে ম্যাকিয়াভেলিকে শুনতে খারাপ লাগলেও বর্তমান বিশ্বের আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ম্যাকিয়াভেলিই মূলভিত্তি। আবার তিনি মনে করেন, কোন দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা মুখ্য, যার জন্য যে কোন দেশে সেনাবাহিনী গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

৪. রাজনীতির বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি স্থাপন: ম্যাকিয়াভেলি তার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ঘটনার পরিপেক্ষিতে রাজনৈতিক আরোহ পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে রাজনীতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্থাপন করেন।

৫. আইনের শাসন: ম্যাকিয়াভেলি ধর্মগ্রন্থ ও আধ্যাত্মিক আইনের পরিবর্তে বাস্তবসম্মত আইনের উপর গুরুত্বারোপ
করেন। আইন পালনে শাসক ও শাসিত উভয়কেই তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর মতে, শাসিতের ক্ষেত্রে আইন অবশ্য পালনীয়। তাঁর মতে, রাষ্ট্রে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে এবং নাগরিক জীবন ও সম্পত্তির বিধান করতে আইনের শাসন দরকার।

৬. সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা: ম্যাকিয়াভেলি আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। আর এ ক্ষমতার সাহায্যেই রাষ্ট্রে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

৭. ক্ষমতা সম্প্রসারণ নীতি: আধুনিক রাজনীতি ক্ষমতার রাজনীতি। ক্ষমতা লাভের পদ্ধতি, কিভাবে ক্ষমতার সম্প্রসারণ সম্ভব সে বিষয়ে ম্যাকিয়াভেলিই সর্বপ্রথম সুস্পষ্ট দর্শন প্রচার করেন।

৮. ধর্ম থেকে রাজনীতি পৃথকীকরণ: মধ্যযুগের রাজনীতিকে গির্জার বাইরে বের করে নিয়ে আসতে ম্যাকিয়াভেলির
অবদান সবচেয়ে বেশি।

৯. দেশপ্রেমিক: একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক হিসেবে ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন অনন্য। ইতালির জাতীয় ঐক্য অর্জনের জন্য তিনি তাঁর রাষ্ট্রদর্শনে গভীরভাবে আলোচনা করেন। গ্যারিবন্ডি, ক্যাভুর প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতাগণ ম্যাকিয়াভেলিরা নিকট থেকে দেশপ্রেমের পাঠ শিক্ষা নেন।

১০. বাস্তববাদী দার্শনিক: পূর্ববর্তী রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণের মত ম্যাকিয়াভেলি কল্পনাবিলাসী ছিলেন না, বরং ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন অত্যন্ত বাস্তববাদী। ডানিং বলেছেন, “গোটা মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তাবিদেরা যখন কল্পনার রথে চড়ে রাজনৈতিক তন্ত্র গড়ে তুলেছেন, ম্যাকিয়াভেলি তখন বাস্তব ও তত্ত্বের মধ্যে সফলতার সাথে সমন্বয় সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।”

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, ম্যাকিয়াভেলি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক। আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনে তার অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তিনি প্রথম রাষ্ট্রচিন্তাকে মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে আধুনিক আলোর জগতে নিয়ে আসেন। এমনকি রাষ্ট্র শব্দটি যে অর্থে ব্যবহার হয় তার উদ্ভাবকও তিনি। তার রাষ্ট্রচিন্তার উপর্যুক্ত সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও একথা সবর্জনস্বীকৃত যে, ম্যাকিয়াভেলিই আধুনিক রাষ্ট্র বিকাশের জনক এবং তিনি মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তার আলোর দিশারি হয়ে এসেছিলেন।