অথবা, রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে ‘সামাজিক চুক্তি’ মতবাদটি মূল্যায়ন কর।
উত্তরঃ ভূমিকা: রাষ্ট্রের উৎপত্তিবিষয়ক একটি কাল্পনিক মতবাদ হলো সামাজিক চুক্তি মতবাদ। নানাদিক দিয়ে এ মতবাদটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। মতবাদটি কেবল রাষ্ট্রের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে না, শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক নির্ধারণ ও রাষ্ট্রং প্রকৃতিও ব্যাখ্যা করে থাকে। সামাজিক চুক্তির তত্ত্ব রাষ্ট্র সৃষ্টির মূলে মানুষের সচেতন প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং রাষ্ট্রটিয়ার আধুনিকতার ধারা প্রবর্তন করেছে। তাই সামাজিক চুক্তি মতবাদকে অনেকে রাষ্ট্র সৃষ্টির উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন।
সামাজিক চুক্তি মতবাদের মূল্যায়ন: সামাজিক চুক্তি মৃতবাদ রাষ্ট্রের প্রকৃতির ব্যাখ্যা হিসেবে জরুত্ব হারিয়েছে। তা
সত্ত্বেও রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে মতবাদটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনস্বীকার্য। এক্ষেত্রে কতকগুলো বিষয় উল্লেখযোগ্য। যেমন-
১. গণতন্ত্রের ভিত্তি: এ চুক্তিবাদ রাজতন্ত্রের ভিত্তিকে জনগণের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। শাসনব্যবস্থাকে শাসিতের সম্মতির উপর স্থাপন করে আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনের পথ প্রশস্ত করেছে। Barker এর মতানুসারে, “চুক্তিবাদ ন্যায় ও স্বাধীনতা এ দুই গণতান্ত্রিক আদর্শের উপর গুরুত্বারোপ করেছে।” তার ফলে জনগণের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সুদৃঢ় হয়।
২. রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ: সামাজিক চুক্তি মতবাদই সর্বপ্রথম রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছে। জন লকের আগে এ পার্থক্য কেউ করে নি।
৩. রাজনৈতিক ধারণাসমূহের বিকাশ: ন্যায়, সাম্য, স্বাধীনতা প্রভৃতি রাজনৈতিক ধারণাসমূহের বিকাশ ও বিবর্তনের ক্ষেত্রে সামাজিক চুক্তি মতবাদটি যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কেননা চুক্তিবানের মানবিক অধিকারের ঘোষণা ঐতিহাসিক মর্যাদাযুক্ত।
৪. রাজনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা: চুক্তিবাদের মাধ্যমে রাজনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রুশোর সামা ও সমানাধিকারের তত্ত্ব থেকেই সাম্প্রতিককালে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ধারণা বিস্তার লাভ করেছে।
৫. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ধারণার উৎপত্তি: ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ধারণার উৎপত্তি ও বিকাশে চুক্তিবাদ সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। জন লক সরকারি চুক্তির শর্ত হিসেবে জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি সংরক্ষণের কথা বলেছেন।
৬. সার্বভৌমত্বের বিকাশ: ‘সার্বভৌমিকতার’ ধারণাকে যথাযথভাবে বিকশিত করতে সামাজিক চুক্তি মতবাদ সাহায্য করেছে। হবসের আইনগত সার্বভৌমিকতা, লকের রাজনৈতিক সার্বভৌমিকতা এবং রুশোর জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা প্রচার করেছে।
৭. রাষ্ট্রের ভিতি সম্মতি: “রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো সম্মতি, পেশীশক্তি নয়।” এ সত্যটিকে চুক্তিবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
৮. মষ্ট্রিচিয়ায় চুক্তিবাদের প্রভাব: রাষ্ট্রচিন্তায় এ চুক্তিবাদের ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। অনেকের মতানুসারে, বেস্থামের হিতবাদ হলো লকের মূল তত্ত্বের সম্প্রসারিত রূপ। আবার কারও কারও মতে, লকের মতবাদই হলো মন্টেফুর ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির উৎল।
উপসংহার: উপর্যুক্ত ভালোচনা শেষে বলা যায় যে, সামাজিক চুক্তি মতবাদটি একেবারে মূল্যহীন নয়। আধুনিক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে সামাজিক চুক্তি মতবাদের উপর ভিত্তি করে। জন লক ও রুশো উভয়ই বলেছেন, “মানুষ নিজেই ভাদের রাজনৈতিক ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক।” তাদের জীবনের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার ও সম্পত্তির অধিকার সংরক্ষণের জন্যই মানুষ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করেছিল।