রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক মতবাদের শুরুত্ব আলোচনা কর।

অথবা, রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত ক্রমবিবর্তন মতবাদের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা কর।

অথবা, রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে বিবর্তনমূলক মতবাদ আলোচনা কর।

অথবা, রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে এটি সৃষ্টি হয় নি। উক্তিটি বিশ্লেষণ কর এবং যে সব শক্তি ও উপাদান রাষ্ট্রের বিবর্তনে সাহায্য করেছে তা বিশদভাবে উল্লেখ কর।

উত্তরঃ ভূমিকা: আধুনিক যুগের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনস্বীকৃত মতবাদ হচ্ছে ঐতিহাসিক বিবর্তনমূলত মতবাদ। এ মতবাদ অনুসারে রাষ্ট্র একদিনে সৃষ্টি হয় নি, বরং অনেক ঘাতপ্রতিঘাত ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আবির্ভাব হয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মতবাদ রাষ্ট্র মূলত ক্রমবিকাশের ফল।

ঐতিহাসিক মতবাদের গুরুত্ব : ঐতিহাসিক মতবাদের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হলো:

১. ঐক্যবোধ সৃষ্টি: পূর্বে সমাজ বিশৃঙ্খল ছিল। ঐতিহাসিক মতবাদের মাধ্যমে সমাজে ঐক্যবোধ সৃষ্টি হয়। রক্তের
বন্ধনের কারণে সমাজের সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং রাষ্ট্র গঠন করে।

২. বর্বরতা পরিহার: বিবর্তনমূলক মতবাদের মাধ্যমে মানুষের চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন আসে। তারা পূর্বের বর্বরতা পরিহার করে রাষ্ট্র গঠন করে এবং মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটায়।

৩. সচেতনতা বৃদ্ধি: এ মতবাদের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সচেতনতাবোধ সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলে। এ রাজনৈতিক সংগঠনের পূর্ণরূপ হচ্ছে রাষ্ট্র।

৪. সহযোগী মনোভাব: এ মতবাদের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব গড়ে উঠে। পূর্বে মানুষ বনে জঙ্গলে বাস করতো। পরবর্তীতে তারা অর্থনৈতিক প্রয়োজন বোধ করে এবং বিভিন্ন ক্রিয়াকর্ম করে। এর ফলে তাদের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হয়।

৫. ধর্মীয় চর্চা: ধর্ম বিবর্তনমূলক মতবাদের একটি অন্যতম উপাদান। ধর্মের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সমাজ গড়ে উঠত এবং পরবর্তীতে বিবর্তন হয়ে এসব সমাজ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ফলে এসব রাষ্ট্রে ধর্মীয় চর্চা অনেক বেশি দেখা যায়।

সমালোচনা: বিবর্তনমূলক মতবাদের অনেক গুরুত্ব থাকলেও এ মতবাদ সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। নিম্নে সমালোচনাগুলো উল্লেখ করা হলো:

i. এ মতবাদ অস্পষ্টতার দোষে দুষ্ট। বিবর্তনমূলক মতবাদে রাষ্ট্রের উৎপত্তির কথা বলা হয়েছে।

ii. এ মতবাদটি অসম্পূর্ণতা দোষে দুষ্ট। এ মতবাদের সমর্থকদের মতে ব্যক্তি সম্পত্তি ও রাজনৈতিক চেতনার ফলে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে।

iii. এ মতবাদ অনেকটা প্রগতি ও শান্তির পরিপন্থি। বিবর্তনমূলক মতবাদের একটি স্তর হচ্ছে যুদ্ধবিগ্রহ।

iv. এ মতবাদে রাষ্ট্র কখন সৃষ্টি হয়েছে তার কোন স্পষ্ট প্রমাণ নেই। শুধু জানা যায়, কিভাবে রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে।

v. বলপ্রয়োগ ও যুদ্ধবিগ্রহ রাষ্ট্র সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যুদ্ধ দ্বারা একটি রাষ্ট্রের কখনো শান্তি সম্ভব নয়। শক্তি প্রয়োগে সামাজিক সম্প্রীতি সম্ভব নয়।

vi. বলপ্রয়োগের ফলে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো বেশি ক্ষমতা ভোগ করে এবং আধিপত্য ভোগ করে এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হয়।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিবর্তনে যেসব উপাদান কাজ করেছিল, সে উপাদানকে সুব্যবস্থিতভাবে উপস্থাপন করাই ঐতিহাসিক বিবর্তন, মতবাদের উদ্দেশ্য। এতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, রাষ্ট্র বিধাতার সৃষ্ট বা মানুষের সুচিন্তিত কাজ নয়, বরং রাষ্ট্র মানবসমাজের নিরবচ্ছিন্ন ক্রমবিকাশের ফল।