রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তি মতবাদের সমালোচনা কর।

অথবা, রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত সামাজিক চুক্তিমতবাদের সমালোচনা ব্যাখ্যা কর।

উত্তরঃ ভূমিকা: রাষ্ট্রের উৎপত্তিবিষয়ক একটি কাল্পনিক মতবাদ সামাজিক চুক্তি মতবাদ। নানা দিক দিয়ে এ শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক নির্ধারণ ও রাষ্ট্রের মতবাদটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। মতবাদটি কেবল রাষ্ট্রের উৎপত্তি ব্যাখ্যা প্রকৃতিও ব্যাখ্যা করে থাকে। সামাজিক চুক্তির তত্ত্ব রাষ্ট্র সৃষ্টির মূলে মানুষের সচেতন প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং রাষ্ট্রচিন্ত ায় আধুনিকতার ধারা প্রবর্তন করেছে। তাই সামাজিক চুক্তি মতবাদকে অনেকে রাষ্ট্র সৃষ্টির উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন।

সামাজিক চুক্তি মতবাদের সমালোচনা: বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে সামাজিক চুক্তি মতবাদের বিরোধিতা করেন। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই এ মতবাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের মধ্যে হিউম, হেনরি মেইন, বার্ক, বেস্থাম, পোলক প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নিম্নে মতবাদটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুক্তির অবতারণা করা হলো:

১. অনৈতিহাসিক: সামাজিক চুক্তি মতবাদটি অনৈতিহাসিক। ইংরেজ দার্শনিক হিউম মন্তব্য করেছেন, “সামাজিক চুক্তি মতবাদ অনৈতিহাসিক।” মানবসভ্যতার সমগ্র ইতিহাস অনুসন্ধান করলেও এ রকম কোন চুক্তির উদাহরণ পাওয়া যায় নি।

২. অবিশ্বাস্য: মতবাদটি অবিশ্বাস্য। কারণ প্রাকৃতিক অবস্থায় আদিম মানুষের রাষ্ট্র সম্বন্ধে কোন ধারণা ছিল না। সুতরাং তাদের পক্ষে রাষ্ট্রের উপযোগিতা উপলব্ধি করাও সম্ভব ছিল না। এ অবস্থায় তারা চুক্তির মাধ্যমে হঠাৎ একদিন রাষ্ট্র সৃষ্টি করল এরকম ভাবনা অবিশ্বাস্য।

৩. অযৌক্তিক: এ মতবাদটি অযৌক্তিক। কারণ চুক্তির ভিত্তি হলো রাষ্ট্রনীতিক আইন। কিন্তু এ মতবাদের প্রবক্তাদের মতে, প্রাক রাষ্ট্রীয় অবস্থার হাত থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে অধিবাসীরা চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে চুক্তি সম্পাদনের কথা অযৌক্তিক।

৪. সন্তোষজনক নয়: রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বা রাষ্ট্রের বৈধতা প্রসঙ্গেও চুক্তিবাদী বক্তব্য সন্তোষজনক নয়। চুক্তিকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করলে চুক্তি সম্পাদনকারী পূর্বপুরুষদের কাছেই এবং তাদের ক্ষেত্রেই তা বাধ্যতামূলক। উত্তর পুরুষগণ খেয়ালখুশিমতো এ রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে পারেন বা তারা রাষ্ট্রের অবলুপ্তি ঘটাতে পারেন। অর্থাৎ মতবাদটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের পক্ষে বিপজ্জনক।

৫. কাল্পনিক: এ মতবাদটি কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে কোন মিল নেই। হেনরি মেইন বলেছেন, “চুক্তির ন্যায় সুদ্ধ ধারণা আদিম মানুষের মধ্যে কখনো হতে পারে না।” এটা সম্পূর্ণভাবে একটি কাল্পনিক ধারণা।

৬. প্রাকৃতিক আইন ও অধিকারের অস্তিত্ব অসম্ভব: এ চুক্তি মতবাদের প্রবক্তারা প্রাক রাষ্ট্রীয় অবস্থায় প্রাকৃতিক স্বাভাবিক অধিকারের কথা বলেছেন। কিন্তু চুক্তিবাদের এ ধারণা যথার্থ নয়। চুক্তিবাদের প্রাকৃতিক নিয়ম আইন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে প্রকৃত কোন আইনের অস্তিত্ব অসম্ভব। আবার স্বাভাবিক অধিকারের ধারণাও ভ্রান্ত। সভ্যসমাজ ছাড়া স্বাভাবিক অধিকার কল্পনা করা যায় না।

৭. রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক বিষয়ক ধারণা ভ্রান্ত: সামাজিক চুক্তি মতবাদ রাষ্ট্রকে অংশীদারি কারবারের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। কারণ চুক্তির ভিত্তিতেই উভয়ের সৃষ্টি হয়। কিন্তু রাষ্ট্র এবং অংশীদারি কারবার কোনক্রমে সমপর্যায়ের সংগঠন নয়। অংশীদারি কারবারের সাথে অংশীদারদের সম্পর্কের থেকে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকদের সম্পর্ক অনেক বেশি দৃঢ় এবং অবিচ্ছেদ্য।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে আমরা বলতে পারি যে, রাষ্ট্রের উৎপত্তির পিছনে যেসব মতবাদ আলোচনা করা হয় তাদের মধ্যে সবচেয়ে সমালোচিত মতবাদ হলো সামাজিক চুক্তি মতবাদ। কারণ এ মতবাদ সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও অযৌক্তিক।