অথবা, রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা কর।
অথবা, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যে যোগসূত্র নির্ণয় কর।
উত্তরঃ ভূমিকা: রাষ্ট্র ও ব্যক্তি দু’টি স্বতন্ত্র উপাদান। রাষ্ট্র হলো বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান, আর ব্যক্তি হলো রাষ্ট্রের অন্ত গত একটি উপাদান, বা রাষ্ট্র গঠনে সাহায্য করে। তবে ব্যক্তি ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না কারণ ব্যক্তি হচ্ছে রাষ্ট্রের অবয়ব। রাষ্ট্র সৃষ্টি থেকেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা রাষ্ট্র ও ব্যক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। এদের মধ্যে কেউ বলেছেন, রাষ্ট্র ব্যক্তির উর্ধ্বে আবার কেউ বলেছেন রাষ্ট্র ব্যক্তিকল্যাণের উপায় মাত্র।
রাষ্ট্র ও নাগরিক বা ব্যক্তির সম্পর্ক: নিম্নে রাষ্ট্র ও নাগরিক বা ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন চিন্ত বিদদের ধারণা নিম্নে দেয়া হলো:
১. ভাববাদী দার্শনিকদের ধারণা: ভাববাদী দার্শনিকরা রাষ্ট্রকেই সবচেয়ে বড় করে দেখেছেন। ভাববাদী দার্শনিক হেগেলের অভিমত অনুসারে রাষ্ট্র একটি নৈতিক সত্তা। ব্যক্তি তার প্রকৃত সত্তাকে রাষ্ট্রের মধ্যে খুঁজে পায়। ব্যক্তির স্বাধীনতা
নির্ভর করে রাষ্ট্রের উপর। রাষ্ট্রের উপরই ব্যক্তির সকল প্রকার অধিকার নির্ভর করে। সুতরাং রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক পুরোপুরিভাবেই ঐক্যের। ব্যক্তি যেমন কখনোই রাষ্ট্রের ইচ্ছার বিরোধিতা করতে পারে না, তেমনি রাষ্ট্রের ইচ্ছার বাইরেও ব্যক্তির কোন ইচ্ছা থাকতে পারে না।
২. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দার্শনিকদের ধারণা: উনবিংশ শতকের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দার্শনিকগণ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে বিপরীতমুখী বলেছেন। জন স্টুয়ার্ট মিল ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ককে দেখেছেন পরস্পর বিরোধী সম্পর্ক হিসেবে। বাক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী চিন্তাবিদদের মতে, রাষ্ট্র যেহেতু ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেহেতু রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থি। এ কারণে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীরা মনে করেন যে রাষ্ট্র ব্যক্তির জীবনে কম হস্তক্ষেপ করে সে রাষ্ট্রই উত্তম।
৩. নৈরাজ্যবাদী দার্শনিকদের ধারণা: বাকুনিন, ক্রোপেটকিন ইত্যাদি দার্শনিকগণ ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থি।
নৈরাজ্যবাদীগণ রাষ্ট্রের প্রয়োজনের কথা অস্বীকার করেছেন।
৪. আধুনিক উদারনৈতিক দার্শনিকদের ধারণা: টি. এইচ. গ্রিন, হবহাউস প্রমুখ উদারনৈতিক দার্শনিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার মধ্যে সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রের কাজ ব্যক্তির মানসিক ও চারিত্রিক বিকাশের জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করা। অধ্যাপক লাস্কি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছেন, “ব্যক্তিস্বাধীনতা অর্থ এমন পরিবেশ, যেখানে ব্যক্তি তার আত্মবিকাশের সুযোগ পায়। রাষ্ট্র আইনানুগভাবে অধিকার প্রদানের মাধ্যমে এরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করে।”
সুতরাং রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সম্পর্ক তত্ত্বগত দিক থেকে বিরোধপূর্ণ নয় বরং পরিপূরক। যে কোন দিক থেকেই ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্বাচন করা হোক না কেন, বাক্তি যেমন রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ রাষ্ট্রও তেমনি ব্যক্তির অত্যাবশ্যকীয় অর্জন। রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সম্পর্ক নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১. ব্যক্তির সমন্বয়ে রাষ্ট্র গঠিত: রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কারণ ব্যক্তির অস্তিত্ব ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। জনমানবহীন মরুভূমি বা অরণ্য রাষ্ট্র হতে পারে না।
২. রষ্ট্রি ব্যক্তির মঙ্গল সাধন করে: রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেছেন, “ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে। তাই রাষ্ট্রের একমাত্র লক্ষ্য হবে ব্যাক্তির উন্নতি ও সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ সাধন করা। ব্যক্তির স্বকীয়তা ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সহায়তা করবে।
৩. রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূল ব্যক্তি: রাষ্ট্রের মঙ্গল ব্যক্তির মঙ্গলের মানদণ্ডে পরিমাপ করা হয়। তাই কোথাও যদি ব্যক্তির।
মঙ্গলকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়ন বা মঙ্গল পরিদৃষ্ট হয়, তবে তা কল্যাণকর বলে ভাবা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা বলা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত ছিল। কিন্তু সেখানে ব্যক্তির সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব হয় নি বলেই এর পতন ঘটেছে।
৪. রাষ্ট্র ও ব্যক্তি একটি অপরটির পরিপূরক : রাষ্ট্র ও ব্যক্তি একটিকে অপরটির পরিপূরক হিসেবে ধরা হয়। একটি ছাড়া অন্যটি চলতে পারে না। এ দু’টি যেন একই মুদ্রার দু’টি পিঠ। ব্যক্তি ছাড়া যেমন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, তেমনি রাষ্ট্র ছাড়া ব্যক্তির অস্তিত্ব কল্পনার অযোগ্য। তাই একটি আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য সৎ, যোগ্য এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক একান্ত আবশ্যক।
৫. নির্ভরশীলতা: রাষ্ট্র ও ব্যক্তির অস্তিত্ব পরস্পর পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। ব্যক্তি যেমন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা করবে, তেমনি রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মঙ্গল সাধনে নিয়োজিত থাকবে।
৬. রাষ্ট্র পরিচালিত হয় ব্যক্তির দ্বারা: রাষ্ট্র তার উপাদানগুলোকে নিজে নিজে পরিচালিত করতে পারে না। কতিপয় ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনা করে। অর্থাৎ ব্যক্তিই রাষ্ট্র পরিচালনা করে।
৭. ব্যক্তি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী: সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের একটি অন্যতম উপাদান। আর’ ব্যক্তিই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখে। সর্বোপরি ব্যক্তির সমন্বয়ে দেশ প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করে প্রতিরক্ষা বাহিনী।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। ব্যক্তি ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্র ব্যক্তির কল্যাণে গড়ে উঠে এবং ব্যক্তি রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালায়। তাই রাষ্ট্র ও নাগরিক বা ব্যক্তি একে অন্যের পরিপূরক।