সংসদীয় সরকারের মূল বৈশিষ্ট্যাবলি আলোচনা কর।

অথবা, মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর।

উত্তর: ভূমিকা: ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির উপর ভিত্তি করে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়, যথা: সংসদীয় সরকার ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। সংসদীয় সরকার সম্পর্কে গার্নার বলেন, “মন্ত্রিীপরিষদ শাসিত সরকার হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে প্রকৃত শাসক প্রধান কার্যাবলির জন্য আইনসভার কাছে দায়ী থাকে।” এরূপ সরকারকে দায়িত্বশীল সরকারও বলা হয়।

সংসদীয় সরকারের বৈশিষ্ট্য: নিম্নে সংসদীয় সরকারের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো:

১. সামমাত্র শাসক প্রধান: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের দুপ্রকার শাসক প্রদান দেখা যায়। যথা: নামমাত্র এবং প্রকৃত শাষক প্রধান। প্রকৃত শাসক প্রধান সরকার প্রধান এবং নামমাত্র শাসক প্রধান রাষ্ট্রপ্রধান নামে পরিচিত। মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের নামমাত্র শাসক প্রধান অবশ্যই থাকে। ব্রিটেনের রাজা বা রানী নামমাত্র এবং প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত শাসক প্রধান।

২. মায়িত্বশীল শাসন: শাসন বিভাগ আইনসভার কাছে দায়ী থাকে। আইনসভার আস্থাভাজন না হয়ে শাসন বিভাগ ওমতায় বহাল থাকতে পারে না। আইনসভা অনাস্থা আনয়নে যে কোন সময় শাসন বিভাগকে অপসারণ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী ও তার কেবিনেট আইনসভার কাছে দায়ী। পার্লামেন্টকে পাশ কাটিয়ে শাসন বিভাগ চলতে পারে না।

৩. যৌথ দায়িত্ব: শাসন বিভাগ আইনসভার কাছে ব্যক্তিগত এবং যৌথভাবে দায়ী থাকে। স্বীয় কার্যাবলির জন্য সমগ্র মন্ত্রিপরিষদ আইনসভার কাছে দায়ী। আইনসভার আস্থা হারালে কেবিনেটের পতন ঘটে। সুনাম অর্জনে যেমন কেবিনেট প্রশংসার পাত্র হয় দুর্নামের ক্ষেত্রেও সমগ্র কেবিনেট দায়ী। Lord morely এর ভাষায়, “ব্রিটেনের কেবিনেটেক প্রধান চিহ্নই হলো এর সংযুক্ততা এবং অবিভাজ্য দায়িত্ব

৪. সুসম্পর্ক: সংসদীয় সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আইন ও শাসন বিভাগের মধ্যে সুসম্পর্ক বর্তমান থাকে। এক বিভাগ অন্য বিভাগের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারে। আইনসভার উচ্চ পর্যায়ের সদস্যবৃন্দই সাধারণত মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হন, তাই তারা আইনসভায় নেতৃত্ব প্রদান করতে পারেন। কার্টারের ভাষায়, পার্লামেন্টারী সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো যে আইন ও শাসন বিভাগের মিশ্রণ।

৫. প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব: প্রধানমন্ত্রী সমগ্র শাসনের প্রাণকেন্দ্র। তাকে কেন্দ্র করেই শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীকে কেবিনেট তোরণের খিলান বলা হয়। তিনি সমগ্র শাসনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রধানমন্ত্রী আইনসভারও নেতা এবং তাকে ঘিরেই সবকিছু পরিচালিত হয়।
Grevares বলেছেন যে, সরকার হলো দেশ পরিচালনাকারী এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকারের পরিচালনাকারী।

৬. বিরোধী দল: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার দলীয় সরকার। এখানে শক্তিশালী বিরোধী দল বর্তমান থাকে।
বিরোধী দল ছাড়া এ সরকার চলতে পারে না। ব্রিটেনে বিরোধী দলের খুব মর্যাদা দেয়া হয়। বিরোধী দলকে মহামান্য রাজার বিরোধী দল বলা হয়।

৭. ক্যাবিনেটের প্রাধান্য: প্রধানমন্ত্রী হর্তাকর্তা হলেও কেবিনেট বিরাট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। জন মেরিওট বলেছেন যে, কেবিনেট হলো প্রধান স্তম্ভ যাকে কেন্দ্র করে সমগ্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হয়। হারভি ও বাথারের কথায়, ‘যদিও পার্লামেন্ট আইনত সর্বেসর্বা, বাস্তবে ফিন্তু এর ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কার্যকর হয় ক্যাবিনেটের আদেশ মতে।” তিনি আবার বলেন, সেখানে ক্যাবিনেট হলো নীতি নির্ধারণের প্রধান উৎস। Marriot এর ভাষায়, ব্রিটেনের কেবিনেটের চারদিকে সমগ্র রাজনৈতিক কার্যক্রম আবর্তিত হয়।

৮. গার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব : পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হয় এবং এর সিদ্ধান্ত ভিন্ন কোন কাজ হতে পারে না। শাসন বিভাগ আইনসভার অনুমতি ব্যতিরেকে কোন কাজ করতে পারে না। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট সার্বভৌম। এমন কোন আইন নেই যে পার্লামেন্ট পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন করতে পারে না। পার্লামেন্টারী শাসনে সংসদের ক্ষমতা অবশ্যই বেশি থাকবে। সেজন্য আনফ্রেন্ড ডি. মেজিয়া বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রধান কুসংস্কার ছিল যে, রাজার ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে, বর্তমানে প্রধান কুসংস্কার হলো, পার্লামেন্ট তদ্রূপ ক্ষমতা প্রাপ্ত।

৯. দলীয় শাসন ব্যবস্থা: সংসদীয় ব্যনছায় সাধারণত দেখা যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের মধ্য হতে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে থাকে। আবার অনেক সময় একাধিক দলের সমন্বয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। কোয়ালিশনের নেতাই সরকারের কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে।

১০. দ্বৈত দায়িত্বশীলতা: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত শাসন ব্যবস্থায় মন্ত্রীদের মধ্যে দ্বৈত দায়িত্বশীলতা লক্ষ্য করা যায়। এখানে একজন মন্ত্রী আইনসভায়ও বসে এবং সচিবালয়েও বসে শাসনকার্য পরিচালনা করে থাকে।

১১. সুপরিবর্তনীয় সংবিধান: মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের সংবিধান সাধারণত সুপরিবর্তনীয় হয়। অবশ্য ফেডারেল পার্লামেন্টারী ব্যবস্থায় এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়।

১২. গোপনীয়তা: সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা একাধিক মন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত থাকে। কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সংসদে আলোচনা করা যাবে না। উদাহরণ স্বরূপ দলীয় সদস্যদের মধ্যে ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হতে পারে কিন্তু এ ব্যাপারে সংসদে আলোচনা করা যাবে না।

উপসংহার: উপর্যুক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর আলোকে বলা যায় যে, সংসদীয় সরকার সবচেয়ে বেশি গণতান্ত্রিক, দায়িত্বশীল ও সময় উপযোগী। এ শাসন ব্যবস্থায় সরকার জনমতকে উপেক্ষা করে স্বৈরাচারীর আশ্রয় নিতে পারে না। তাই জনকল্যাণকর রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা অন্যান্য ব্যবস্থা হতে অধিক জনপ্রিয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।