অথবা, হৎসকে কেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দার্শনিক বলা হয় ব্যাখ্যা কর।
অথবা, “টমাস হবস একজন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী” তুমি কি এ উক্তিটির সাথে একমত?
অথবা, তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দেখাও।
অথবা, একজন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী হিসেবে টমাস হবসের অবস্থান মূল্যায়ন কর।
অথবা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের কোন কোন বৈশিষ্ট্য হবসের মধ্যে বিদ্যমান? লিখ।
উত্তরঃ ভূমিকা: প্রকৃতির রাজ্যের বিশৃঙ্খল পরিবেশ হতে ব্যক্তিকে উদ্ধার করাই ছিল হক্সের রাষ্ট্রচিন্তার মূল উৎস। ব্যক্তিস্বাতন্ত্রাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যই তিনি শাসকের হাতকে শক্তিশালী করার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেছেন। অধ্যাপক ম্যাকগভার্নের মতানুসারে, “হবস সর্বোপরি ব্যক্তি, ব্যক্তির অধিকার ও সম্মানের সাথে সংশ্লিষ্ট, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিবাদই তাঁকে সরাসরি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রবাদে অর্থাৎ রাষ্ট্রই ব্যক্তির যাবতীয় কাজকর্মের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক, এ বিশ্বাস নিয়ে গিয়ে হাজির করেছে।” হবস বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করেছেন ব্যক্তিকে দিয়ে।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী হিসেবে হবস: নিম্নে হবসকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দার্শনিক হিসেবে আখ্যায়িত করার কারণগুলো আলোচনা করা হলো:
১. ব্যক্তির কল্যাণ নিশ্চিতকরণ: হবসকে কর্তৃত্ববাদী দার্শনিক হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তিনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি যা কিছু করেছেন তা জনগণের সার্বিক কল্যাণের উদ্দেশ্যেই করেছেন। রাজার হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা অর্পণের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তিনি প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তি, জানমালের নিরাপত্তা ও সুখশাস্তির নিশ্চয়তা বিধানের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।
২. ব্যক্তিস্বাধীনতা: হবসের রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তিস্বাধীনতা লক্ষণীয়। তিনি বলেছেন, সার্বভৌম শক্তি যেসব কাজ করতে নিষেধ করে নি ব্যক্তি সেসব কাজ করতে পারবে। ক্রয়বিক্রয়, নিজেদের মধ্যে চুক্তি সম্পাদন ও বাসস্থান নির্মাণ ইত্যাদি কাজে সার্বভৌম শক্তি কোন বাধা দিতে পারবে না। চুক্তির শর্তে যেসব বিষয় উল্লেখ নেই সার্বভৌম শক্তি সেসব বিষয়ে হস্তক্ষেপও করতে পারবে না। এসব কারণে হবসকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী বলা হয়ে থাকে।
৩. সরকারের বিরোধিতা করার অধিকার: হবস সরকারের বিরোধিতা করার অধিকার জনগণকে দেয় নি। কিন্তু জীবন রক্ষার খাতিরে শাসকের বিরোধিতা করার অধিকার জনগণকে প্রদান করা হয়েছে। মোটকথা, হক্সের সকল প্রকার মতবাদের মূলে রয়েছে জনগণের স্বার্থ উদ্ধার এবং সুখস্বাচ্ছন্দ্য বিধান করা। আর এজন্য হবসকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দার্শনিক হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়।
৪. রাজনীতিতে অংশগ্রহণ: হবস তাঁর দর্শনে সর্বপ্রথম জনগণের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগ, আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকার দরুন রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হয়েছিল। হবুসের সকল প্রকার তত্ত্বের মূলমন্ত্র ছিল জনগণের স্বার্থরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা। এসব কারণে তাঁকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অধ্যাপক সেবাইন (Sabine) বলেছেন, সার্বভৌমের চরম ক্ষমতা তত্ত্ব বলে দেয় যে, তত্ত্বের সাথে হরসের নাম সাধারণভাবে জড়িয়ে আছে, তা প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রয়োজনীয় পরিপূরক।
৫. জনসম্মতিকে প্রাধান্য দান: টমাস হবস জনগণের সম্মতির ভিত্তিতেই শাসককে সর্বক্ষমতা সম্পন্ন করে তুলেছেন। জনগণ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র সৃষ্টি করে শাসককে রাষ্ট্র শাসনের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। সুতরাং ক্ষমতার মূল উৎস হচ্ছে জনগণ। সর্বাতাকবাদীরা জনগণকে এরূপ প্রাধান্য দেয় না। কেবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীরাই জনগণকে এরূপ প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এজন্য হবসর্কে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী বলে অভিহিত করা হয়।
৬. রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যে প্রত্যক্ষ সংযোগ: দার্শনিক হবস তাঁর দর্শনচিন্তায় রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যে প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপনের কথা বলেছেন। ব্যক্তির অভ্যন্তরে তিনি অন্য কোন সংঘ, সমিতি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের কোন পরামর্শ দেন নি। এজন্য হবসকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী দার্শনিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, হবুসের সামাজিক চুক্তি মতবাদটির কতিপয় সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। ইংল্যান্ডের তৎকালীন বিরাজমান অশান্ত পরিবেশকে মোকাবিলা করার জন্য হসের সামাজিক চুক্তি মতবাদটি বিশেষভাবে উপযোগী ছিল। তাছাড়া হবস এ চুক্তির ফলে সৃষ্ট সার্বভৌম শাসক দ্বারা আইনশৃঙ্খলা ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। তাই Gettell মন্তব্য করেছেন, “No writer has taken a more extreme view, than Hobbes of the absolute nature of sovereignty.”