হবসের সার্বভৌম ক্ষমতার ধারণা সমালোচনা কর।

অথবা, হাসের সার্বভৌম তত্ত্বের সমালোচনাসমূহ বর্ণনা কর।

অথবা, টমাস হবসের সার্বভৌম ক্ষমতার বিভিন্ন দিক সমালোচনাসহ আলোচনা কর।

অথবা, হনসের সার্বভৌম ক্ষমতার তত্ত্বটি সমালোচনাসহ ব্যাখ্যা কর।

অথবা, হবসের সার্বভৌম তত্ত্বের সীমাবদ্ধতাসমূহ কী কী? বিশদভাবে লিখ।

উত্তরঃ ভূমিকা: হবসের সার্বভৌম তত্ত্ব একটি উল্লেখযোগ্য মতবাদ হিসেবে স্বীকৃত। তবে হরসের সার্বভৌম ক্ষমতার ধারণা বিভিন্নভাবে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। যথা:

১. অবাস্তব ও ভিত্তিহীন: কোন কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবক্সের সার্বভৌম তত্ত্বকে অবাস্তব ও ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের মতে, “সার্বভৌম শাসক চরম অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা ব্যবহার করতে সক্ষম নয়।”

২. স্বোচ্ছাচারী ও অত্যাচারী: হরসের সার্বভৌমত্ব শাসককে স্বেচ্ছাচারী ও অত্যাচারী হতে সাহায্য করেছে। সার্বভৌম কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়।

৩. প্রকৃতির রাজ্যে চুক্তির কথা অবান্তর: প্রকৃতির রাজ্যে হবস যে চুক্তি সংঘটিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন তা সম্ভব নয় এজন্য যে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ ভীত, সন্ত্রস্ত ও অসহায় জীবনযাপন করছিল; তাদের পক্ষে কোনরূপ চুক্তি করা সম্ভব ছিল না।

৪. ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থি: হলের সার্বভৌমত্বের ধারণা ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থি। কারণ রাজার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে সংকুচিত করে।

৫. সার্বভৌম নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী: হবক্সের সার্বভৌম নিরঘুশ ক্ষমতার অধিকারী। বাস্তবক্ষেত্রে তা স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের নামান্তর।

৬. স্বার্থবাদী: সার্বভৌম সরকার নিজের ইচ্ছামতো আইন তৈরি করতে পারে। তারা নিজের স্বার্থেই আইন প্রণয়ন করে। এজন্য সার্বভৌম সরকার স্বার্থবাদী হয়ে থাকে।

৭. জনগণের ক্ষমতাকে অস্বীকার: জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। কিন্তু হবসের সার্বভৌম তত্ত্বে জনগণের ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়েছে। এখানে জনগণ রাজার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে, যা বর্তমান প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থায় একেবারেই অচল।

৮. বর্তমানে অসামঞ্জস্য: হবস সার্বভৌম ক্ষমতা তত্ত্বটি প্রদান করেছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। তার এ ধারণা বর্তমানে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

৯. অযৌক্তিক মতবাদ: প্রকৃতপক্ষে হবস যখন সার্বভৌম ক্ষমতা প্রবর্তন করেছেন তখন প্রকৃতির রাজ্যে ভীত সন্ত্রস্ত মানুষের পক্ষে কোন চুক্তিতে উপনীত হওয়া সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু প্রকৃতির রাজ্যে যে চুক্তি সংগঠিত হয়েছে হবস সেটাকে সার্বভৌমিকতার ভিত্তি বলে মনে করেন। সুতরাং এ মতবাদ অযৌক্তিক।

১০. অবমাননাকর: টমাস হবস যে চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সার্বভৌম শক্তি সৃষ্টির কথা বলেছেন তা একটি দাসত্বের দলিল ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে জনগণের মনুষ্যত্বের অবমাননা করা হয়েছে।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, হবসের সার্বভৌমত্বের ধারণাটি যতই সমালোচিত হোক না কেন, রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসে তা মোটেই নিরর্থক নয়। হবস তাঁর সার্বভৌমিকতার ধারণা সপ্তদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্ণনা করেছেন। তাই তাঁর ধারণা আধুনিক কালের মাপকাঠিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জীবনের নিরাপত্তা এবং সামাজিক সংহতি রক্ষার কথা বিবেচনা করে একজন চরম ক্ষমতাসম্পন্ন সার্বভৌম রাজাই ছিল প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান কালের পরিপ্রেক্ষিতে একথা বলা যায় যে, হক্সের সার্বভৌমত্বের মতবাদ আধুনিক কালের ফ্যাসিবাদেরই নামান্তর।