অথবা, রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে যেসব বৈসাদৃশ্য রয়েছে তা বর্ণনা কর।
অথবা, রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে বৈপরীত্য উল্লেখ কর।
উত্তরঃ ভূমিকা: আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় রাষ্ট্র ও সমাজকে অভিন্ন মনে করা হয় না। তবে ম্যাকাইভার, বার্কার, লাস্কি প্রমুখ প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানিগণ রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে পার্থক্যমূলক আলোচনা করেছেন।
রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে পার্থক্য: নিম্নে রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে কতকগুলো, পার্থক্য নির্দেশ করা হলো:
১. রাষ্ট্রের প্রতি খ্যাতির আনুগত্য কেন্দ্রীভূত: আইনগত বিচারে রাষ্ট্র হলো একমাত্র সংগঠিত প্রতিষ্ঠান। দেশের শাসনব্যবস্থাকে কার্যকর করার বৈধ ও পরিপূর্ণ দায়িত্ব এ রাষ্ট্রের উপরই ন্যস্ত আছে। তাই জাতির সকলেই এর সদস্য একই ব্যক্তি একই সাথে একাধিক রাষ্ট্রের সদস্য হতে পারে না। তাই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বিভক্ত হয় না। অপরপক্ষে সমাজ হলো বহু সংগঠনের সমষ্টি। কোন ব্যক্তি বিভিন্ন সামাজিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একই সাথে একাধিক সংগঠদেলদ সদস্যপদ গ্রহণ করে। এভাবে সমাজস্থ ব্যক্তিবর্গের আনুগত্য একাধিক সমিতির প্রতি প্রসারিত হয় বা বিভক্ত হয়।
২. সমাজের উদ্দেশ্য ব্যাপকতর: আইনগত উদ্দেশ্য সাধন ক্ষেত্রে রাষ্ট্রে হলো একমাত্র প্রতিষ্ঠান। একমাত্র রাষ্ট্রই আইন প্রণয়ন ও বলবৎকরণের কাজ সম্পাদন করে থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য মূলত আইন বিষয়ক। বার্কারের মতানুসারে, “রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো বৈধ উদ্দেশ্য সাধন। অন্যদিকে, সমাজের উদ্দেশ্য হলো বহু ও বিভিন্ন। সমাজের আর্থিক, নৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভৃতি বহু উদ্দেশ্য বর্তমান। বিভিন্ন সমিতি বা সংগঠনের মাধ্যমে সমাজে এসব দায়িত্ব সম্পাদিত হয়।
৩. স্থায়িত্ব: রাষ্ট্র একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সুসংগঠিত সরকারকে প্রয়োজনবোধে পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু সার্বভৌম রাষ্ট্রের পরিবর্তন করা যায় না। অন্যদিকে, সমাজ সর্বদা পরিবর্তনশীল। সমাজজীবনের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য পূরণ এবং ব্যক্তির পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিকাশের জন্য প্রয়োজনবোধে সমাজকে পরিবর্তন করা যায়।
৪. সার্বভৌম ক্ষমতা: রাষ্ট্র সর্বাত্মক বা চরম সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রাষ্ট্র ব্যক্তির স্বাধীনতা ও অধিকার সংরক্ষণ, ব্যক্তির প্রকৃত সত্তার বিকাশ, সামাজিক জীবন ও মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন ধরনের আইন প্রণয়ন করে। এ আইনগুলো বাধ্যতামূলকভাবে নাগরিকদের উপর প্রযোজ্য। রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি আনুগত্য জ্ঞাপনই ব্যক্তির প্রধান কর্তব্য। রাষ্ট্রীয় আদেশের বিরোধিতা করা অন্যায় এবং গর্হিত কাজ। অন্যদিকে, সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতির ক্ষেত্রে কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
৫. সুনিয়ন্ত্রিত সরকার: রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ পরিচালনার জন্য একটি সুনিয়ন্ত্রিত সরকার থাকে। অন্যদিকে, সমাজ পরিচালনার জন্য কোন সরকার থাকে না।
৬. সমাজের পরিধি ব্যাপকতর: সমাজের পরিধি রাষ্ট্রের পরিধি অপেক্ষা অনেক ব্যাপক। সমাজ মানুষের সার্বিক দিক পরিচালনা করে। অর্থাৎ মানবজীবনের সকল দিকই সমাজের পরিধিভুক্ত। মানুষের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি সাধনই হলো সমাজের উদ্দেশ্য। অন্যদিকে, রাষ্ট্র কেবল মানুষের রাষ্ট্রনৈতিক জীবনকেই নিয়ন্ত্রণ করে।
৭. রাষ্ট্র বলপ্রয়োগ করতে পারে: রাষ্ট্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য পূরণের জন্য বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তা কার্যকরী করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র হলো একটি পীড়নমূলক শক্তির আধারবিশেষ। রাষ্ট্র উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বলপ্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু সমাজ বলপ্রয়োগ করতে পারে না। কারণ সমাজ মূলত স্বেচ্ছাধীন বিভিন্ন সংগঠনসমূহকে নিয়ে গঠিত এবং সমাজের যাবতীয় কাজকর্ম পারস্পরিক সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল।
৮. উপাদানগত: অধ্যাপক গার্নার এর সংজ্ঞানুসারে রাষ্ট্রের চারটি অপরিহার্য উপাদান রয়েছে। যথা: জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌম ক্ষমতা। অন্যদিকে, সমাজের নির্দিষ্ট কোন উপাদান নেই।
৯. নির্দিষ্ট সীমারেখা: রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, সমাজের কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। অর্থাৎ মানুষ যেখানে বসবাস করে সেখানেই সমাজের অস্তিত্ব বিদ্যমান।
১০. ম্যাকাইভার ও লাফির অভিমত: রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য, গঠন পদ্ধতি, কার্যকলাপ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। এ কারণে ম্যাকাইভার এর অভিমত হলো যে, “সমাজ ও রাষ্ট্রকে অভিন্ন মনে করলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়; রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায় না।” অধ্যাপক লাস্কির মতানুসারে, “সমাজ জীবনের মূল সূত্রগুলো রাষ্ট্র নির্ধারণ করে বটে, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজ এক ও অভিন্ন হতে পারে না।”
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার দৃষ্টিকোণ থেকে এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্র হলো স্বাভাবিক, প্রয়োজনীয় এবং মানবিক সংগঠনের চূড়ান্ত রূপ। পূর্ণ বিকাশের পর্যায়ে রাষ্ট্র সর্বাত্মক এবং চরম ক্ষমতার অধিকারী। রাষ্ট্রের নিজস্ব ইচ্ছা এবং ব্যক্তিত্ব আছে। এ ইচ্ছা এবং ব্যক্তিত্ব সকল ব্যক্তির ইচ্ছা ও ব্যক্তিত্বের সর্বোৎকৃষ্ট অংশ নিয়ে গঠিত। মানুষকে সংকীর্ণ লক্ষ্য এবং মানবিক স্বার্থপরতা থেকে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্র তাদের ব্যক্তিত্বের সম্প্রসারণে সাহায্য করে। হেগের মতে, “রাষ্ট্র ব্যক্তিকে সংকীর্ণ থেকে সর্বজনীন লক্ষ্যের দিকে নিয়ন্ত্রিত করে।”