অথবা, রাষ্ট্র ও সরকার সম্পর্কে আলোচনা কর।
অথবা, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা কর।
উত্তরঃ ভূমিকা: মানুষের সংঘবদ্ধ জীবনের চরম অভিব্যক্তি হলো রাষ্ট্র ব্যবস্থা। রাষ্ট্র হচ্ছে সমাজের সর্বোত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যা সমাজভুক্ত মানুষের সমগ্র জীবন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সকল মানুষর রাষ্ট্রের সদস্য। রাষ্ট্র জনগণের অধিকারের সংরক্ষণ করে থাকে। আর রাষ্ট্রের বাস্তব ইচ্ছাকে সরকার প্রয়োগ করে।
রাষ্ট্র: সাধারণত রাষ্ট্র বলতে আমরা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রতিষ্ঠিত এক আবশ্যিক সংগঠনকে বুঝে থাকি।
‘রাষ্ট্র’ শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন যোলো শতকের বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মেকিয়াভেলি। রাষ্ট্র শব্দটি অনেকক্ষেত্রে সরকার, সমাজ, জাতির সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়।
রাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা উত্তম ও পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন অধ্যাপক গার্নার। তাঁর মতে, “রাষ্ট্র হলো ব্যাপক জনসমষ্টি নিয়ে এমন এক জনসমাজ, যা কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, যা বহিঃনিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীন বা প্রায় স্বাধীন এবং যার একটি সংগঠিত সরকার আছে, যে সরকারের প্রতি অধিকাংশ নাগরিক স্বাভাবিকভাবে অনুগত থাকে।”
প্রামাণ্য সংজ্ঞা: বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে তাঁদের কয়েকজন বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর সংজ্ঞা প্রদান করা হলো:
বুন্টসৃলি (Bluntschli) এর মতে, “কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত জনসমাজই রাষ্ট্র।”
অধ্যাপক হল (Prof. Hall) এর ভাষায়, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-সাধনের জন্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এমন জনসমাজই রাষ্ট্র।”
অধ্যাপক ব্রিউস্টার (Brewster) এর মতে, “রাষ্ট্র এমন সংগঠিত জনসমষ্টি, যা কোন সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অধিকারী এবং যার কোন স্বাধীন বা সার্বভৌম সরকার আছে।”
অধ্যাপক এস. এল. ওয়াজবি (Pfof. S. L. Wasby) বলেছেন, “The state is a collection of people
having organised government and possessing autonomy with respect to other such units.” অধ্যাপক লাস্কি (Prof. Laski) তাঁর ‘A Grammar of Politics’ গ্রন্থে রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, “রাষ্ট্র
ভূখণ্ডভিত্তিক সমাজবিশেষ, যা সরকার ও জনগণের মধ্যে বিভক্ত এবং যা এর নিজস্ব ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানের উপর সার্বভৌমত্ব দাবি করে।”
রাষ্ট্রপতি উইলসন (Willson) এর ভাষায়, “কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আইন অনুসারে সংগঠিত কোন জনসমষ্টিকে
রাষ্ট্র বলে।” ওপেনহেইম এর মতে, “কোন জনসমষ্টি এর নিজস্ব সার্বভৌম সরকারের অধীনে কোন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস
করলে তাকে রাষ্ট্র বলে।”
অধ্যাপক আলমন্ড ও কোলম্যান (Prof. Almond and Coleman) এর ভাষায়, “The political system is the legitimate order maintaining or transforming system in the society.”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটল এর মতে, “রাষ্ট্র হলো কয়েকটি পরিবার ও গ্রামের সমষ্টি, যার উদ্দেশ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন।”
উপর্যুক্ত সংজ্ঞাসমূহের আলোকে বলা যায় যে, রাষ্ট্র হচ্ছে বিশ্বের সর্বোচ্চ একক ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যার জনসমষ্টি একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সংগঠিত সরকার গঠন করে স্বাধীনভাবে বসবাস করে।
সরকার: সরকার একটি রাজনৈতিক সংগঠন। আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগ নিয়ে সরকার নামক রাষ্ট্র পরিচালনার যন্ত্রটি গঠিত হয়েছে। এ সরকার শব্দটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়। ব্যাপক অর্থে, সরকার বলতে দেশের সকল নাগরিককে বুঝায়।
সংকীর্ণ অর্থে, সরকার বলতে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত সকল কর্মকর্তা, কর্মচারীর সমষ্টিকে বুঝায়।
অধ্যাপক গার্নার (Prof. Garner) এর মতে, “সরকার হলো একটি কার্যনির্বাহি মাধ্যম বা যন্ত্র, যার দ্বারা সরকারের সাধারণ নীতি নির্ধারিত হয় এবং যার দ্বারা সাধারণ কাজকর্ম নিয়ন্ত্রিত হয় ও সাধারণ স্বার্থ সাধিত হয়।”
অধ্যাপক গেটেল (Prof. Gettell) বলেছেন, “Government is the organization or machinery of the state.” অর্থাৎ, সরকার হলো রাষ্ট্রের একটি সংস্থা বা যন্ত্র।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, রাষ্ট্র মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান। সরকার রাষ্ট্র গঠনের জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। রাষ্ট্র এক বিমূর্তভাব এবং সরকারকে এর বাস্তব রূপ বলে ধরা হয়।