রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে সম্পর্ক আলোচনা কর।

অথনা, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে কী সম্পর্ক?

অথবা, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে যেসব সাদৃশ্য রয়েছে তা বর্ণনা কর।

অথবা, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা কর।

উত্তরঃ ভূমিকা: সরকার ব্যতীত রাষ্ট্র চলতে পারে না। উভয়ের মধ্যেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। চালকবিহীন যেমন জাহাজ চলতে পারে না, তেমনি সরকার ছাড়া রাষ্ট্র অচল। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে সম্পর্ক হলো যেমন রক্ত ও শরীরের সাথে সম্পর্ক।

রাষ্ট্র ও সরকারের সম্পর্ক: নিম্নে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে সম্পর্ক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. উদ্দেশ্যগত সম্পর্ক: উদ্দেশ্যগত দিক থেকে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো তার নিজ ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করা। অর্থাৎ জনগণের সার্বিক কল্যাণসাধন করা। আর সরকারের উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে দেশের শাস্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করে জনকল্যাণ সাধন করা। তাই বলা যায়, উদ্দেশ্যগত দিক থেকে উভয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

২. নির্ভরশীলতা: সরকার ব্যতীত যেমন রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না, তেমনি রাষ্ট্র না থাকলে সরকারের অস্তিত্ব অকল্পনীয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র ও সরকার একে অপরের উপর নির্ভরশীল। সরকার ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা সচল থাকে। সরকার ব্যতীত রাষ্ট্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

৩. বিমূর্ত ধারণা: সরকারের ন্যায় রাষ্ট্রও একটি বিমূর্ত ধারণা। রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্বকারীদের সরকার পরিদৃষ্ট হয় না, শুধু দৃষ্ট হয়। আবার রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠী ও ভূখণ্ড ভিন্ন অন্য কিছুই দৃষ্ট হয় না।

৪. রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা: রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রেও সরকার ও রাষ্ট্রের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। রাষ্ট্রের পক্ষে যেমন তার রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব নয়, তেমনি সরকারও এর সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারে না। তবে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে ভিন্ন পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। বিবর্তিত অবস্থায় ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যদি রাষ্ট্র ও সরকার নিজ নিজ অবস্থানে সচল ও স্থির না থাকে, তবে তাদের কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাবে। রাষ্ট্রের সাথে সরকারের সম্পর্ক বিবর্তিত, বৈপ্লবিক নয়, আর এ সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হতে বাধ্য যদি প্রজাদের কল্যাণে পরিচালিত করা হয়।

৫. রাজনৈতিক প্রত্যয়: রাষ্ট্র এবং সরকার উভয়েই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র যদিও বহুবিধ সামাজিক কার্যাবলি সম্পন্ন করে থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা। আর সরকার একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নানাবিধ কাজ সম্পাদন করে থাকে।

৬. মানসিক দিক থেকে: রাষ্ট্র ও সরকার উভয়েই মানসিক প্রতিফলিত ধারণা। প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্র ও সরকার মানুষের মানসপটে অঙ্কিত দু’টি রাজনৈতিক প্রত্যয়। মানুষের চিন্তাজগতের সাথে সংযুক্ত দু’টি বিমূর্ত প্রত্যয় হচ্ছে রাষ্ট্র ও সরকার। যদি কল্পনা করা হয় রাষ্ট্র ও সরকার আছে, তাহলে তারা আছে, আবার যদি কল্পনা করা হয় রাষ্ট্র ও সরকার নেই, তাহলে তারা অমূর্ত।

৭. সম্পূরক ও পরিপুরক: রাষ্ট্র ও সরকার একে অপরের সম্পূরক ও পরিপূরক উপাদান। একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ। রাষ্ট্রের জন্য যেমন সরকার অত্যাবশ্যকীয়, তেমনি রাষ্ট্র ব্যতীত সরকার অকল্পনীয়। সরকারের ভিত্তিমূল হলো রাষ্ট্র, আবার সরকারের মাধ্যমেই রাষ্ট্র তার ইচ্ছা বাস্তবায়িত করে এবং সরকার রাষ্ট্রকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। তাই বলা যায়, রাষ্ট্র ও সরকার পরস্পর পরস্পরের সম্পূরক ও পরিপূরক হিসেবে কার্যসম্পাদন করে।

৮. বিবর্তিত প্রতিষ্ঠান: বিবর্তনের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। রাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাস মূলত বহু বিবর্তনের ইতিহাস। সুতরাং রাষ্ট্রকে একটি বিবর্তিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য করা হয়। আবার বিবর্তনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী মনিব বা প্রভু আধুনিক যুগে গণতান্ত্রিক সরকারে পরিণত হয়েছে। সুতরাং রাষ্ট্র ও সরকার উভয়ই বিবর্তিত প্রতিষ্ঠান। তাই এদিক থেকে তাদের মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান এবং উভয়ই দু’টি সম্পর্কযুক্ত প্রতিষ্ঠান। সরকার ও রাষ্ট্র উভয়েরই উদ্দেশ্য হলো জনকল্যাণ সাধন করা এবং জনপ্রশাসন গড়ে তোলা। সরকার ও রাষ্ট্র একে অপরকে পরিপূর্ণতা দান করে। অধ্যাপক গার্নার (Garner) উভয়ের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “রাষ্ট্র একটি জীবদেহ আর সরকার হলো তার মস্তিষ্ক।”