“ম্যাকিয়াভেলিকে বুঝতে হলে ষোড়শ শতকে ইতালির রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে হবে”-আলোচনা কর।

অথবা, “ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শন ষোড়শ শতকে ইতালির রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কযুক্ত- ব্যাখ্যা কর।

অথবা, “ম্যাকিয়াভেলি ছিল যথার্থ সময়ের সন্তান আলোচনা কর।

উত্তরঃ ভূমিকা: যোড়শ শতাব্দীর রাষ্ট্রচিত্তার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল নক্ষত্র ম্যাকিয়াভেলি। তিনি সমকালীন ঘটনার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করেছেন। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে তার অবদান অপরিসীম। তবে ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রদর্শন বিশদভাবে উপলব্ধি করার জন্য তার সমকালীন পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেয়া আবশ্যক।

ষোড়শ শতকে ইতালির রাজনৈতিক অবস্থা: যোড়শ শতাব্দীর ইতালির রাজনৈতিক অবস্থার যথাযথ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই ম্যাকিয়াভেলি সম্পর্কে মূল্যায়ন সম্ভব। তাই নিয়ে যোড়শ শতকে ইতালির রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

১. রেনেসাঁর প্রভাব: রেনেসাঁ বা জাগরণ মানুষের চিন্তাধারার উপর বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে। জনগণ পারলৌকিক চিন্তা বাদ দিয়ে ইহলৌকিক ও জড়বস্তু বিষয়ে অধিক মাত্রায় উৎসাহী হয়ে পড়ে। মানুষ জড়বাদী সুখস্বাচ্ছন্দ্যকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে।

২. নতুন শ্রেণির আবির্ভাব: রেনেসাঁর প্রভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ব্যবসায় বাণিজ্যের বেশ উন্নতি হয়। ফলে এক ধরনের বণিক শ্রেণি সৃষ্টি হয়। এ বণিক শ্রেণি কর্তৃক ব্যবসায় থেকে মুনাফা ও পুঁজি গঠনের মাধ্যমে এক সময় বুর্জোয়া শ্রেণির সৃষ্টি হয়।

৩. দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসন: প্রশাসন দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ ছিল। সমগ্র ইউরোপের মধ্যে ইতালির প্রশাসন সর্বাপেক্ষা দুর্নীতিপরায়ণ ছিল বলে মনে করা হতো। নিষ্ঠুরতা, হত্যা ও শঠতা নিত্যদিনের সামাজিক প্রত্যয়। তিনি ক্ষমতা অর্জন, ক্ষমতা সংরক্ষণ ও ক্ষমতার বৃদ্ধি সাধনের পন্থা নির্দেশ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সুশৃঙ্খল উপায়ে ক্ষমতা গ্রহণ।

৪. চরম রাজতন্ত্রের উদ্ভব: মধ্যযুগে গির্জার নির্দেশ বা মত ছিল সর্বেসর্বা, কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীতে এর অবসান ঘটে। রাজনীতি পুরোপুরি রাজার কজায় এসে যায়। প্রয়োজনের তাগিতে রাজা অর্থনীতিকে নিজ আয়ত্তে আনেন। বণিক শ্রেণিও রাজার দলে ভিড়তে থাকে। এভাবে চরম রাজতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে।

৫. ইতালির বিভক্তি: রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইতালির অবস্থা চরম হতাশাজনক ছিল। ইতালি পাঁচটি বৃহৎ রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল- নেপলস, মিলান, ভেনিস, ফ্লোরেন্স, পোপের রাজ্য। এসব রাজ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ লেগে থাকতো। পেতে থাকে। ফলে শাসনতন্ত্রের পতন ঘটে।

৬. শাসনতন্ত্রের অবক্ষয়: মধ্যযুগের ব্যবসায় বাণিজ্যের প্রসারের ফলে বুর্জোয়া শ্রেণির আবির্ভাব এবং রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি

৭. রাজনৈতিক কোন্দল: ইতালির রাষ্ট্রসমূহ বিচ্ছিন্ন থাকায় রাজনৈতিক কোন্দল ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম আকার ধারণ করে। নিজেদের মধ্যে অবিরাম সংঘর্ষ চলতে থাকে। অ্যালোনের মতে, “Everywhere existed governments without supporting tradition or recognized moral authority.”

৮. জাতীয়তাবাদ: যোড়শ শতাব্দীর রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো জাতীয়তাবাদ। ম্যাকিয়াভেলি জাতীয়তাবাদের দিশারি ছিলেন। তিনি ইতালির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো একত্রিত করতে চেষ্টা চালান।

৯. ধর্ম ও নৈতিকতার পৃথকীকরণ: ষোড়শ শতাব্দীর রাজনীতিতে ধর্ম ও নৈতিকতাকে পৃথকীকরণের প্রবণতা দেখা যায়। এক্ষেত্রে ম্যাকিয়াভেলির অবদান লক্ষ্য করা যায়। তিনি ধর্ম ও নৈতিকতাকে রাজনীতি থেকে পৃথক করেন।

১০. খ্রিস্টীয় ধর্মের বিলোপ: যোড়শ শতাব্দীর রাজনীতিতে খ্রিস্টীয় ধর্মের বিলোপ করা হয়। মধ্যযুগে খ্রিস্টধর্মের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে ম্যাকিয়াভেলি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি রাষ্ট্র সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি ঘোষণা করেন, রাষ্ট্র একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে যে অবদান রাখেন তা মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে এক নব অধ্যায়ের সংযোজন। সমকালীন অবস্থার প্রেক্ষাপটে ইতালির রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে তিনি নিজ চিন্তাচেতনাকে বাস্তবায়িত করেন। Prof. Sabine বলেছেন, “Machiavelli more than any other political thinker created the meaning that has been attached to the state in modern political age.” সুতরাং ম্যাকিয়াভেলিকে বুঝতে হলে ষোড়শ শতাব্দীর ইতালির রাজনৈতিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করা আবশ্যক উক্তিটি যথার্থ।