অথবা, রাজনীতি, ধর্ম ও নৈতিকতা সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা বর্ণনা কর।
অথবা, ধর্ম, নৈতিকতা ও রাজনীতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা বর্ণনা কর।
উত্তর: ভূমিকা: Machiavelli more than any other political thinker created the meaning that has been attached to the state in modern political usage.” ম্যাকিয়াভেলি সম্পর্কে Prof, Sabine এর এ উক্তি যথার্থই। ম্যাকিয়াভেলিই প্রথম রাষ্ট্রচিন্তাকে মধ্যযুগের অন্ধকার থেকে আলোর জগতে নিয়ে আসেন। ম্যাকিয়াভেলি তাঁর ‘The Prince’ এবং ‘The Discourse’ গ্রন্থের মধ্যে রাষ্ট্রের ঐক্য, এজন্য শাসকের ভূমিকা ও রাজনীতির অন্যান্য দিক নিয়ে যে আলোচনা করেছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে একটি রাষ্ট্রের শাসকের ভূমিকা কি হওয়া দরকার এ প্রসঙ্গে তিনি যেসব নির্দেশ বা পরামর্শ দিয়েছেন তা ম্যাকিয়াভেলিবাদ বলে ঘৃণিত হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার তাৎপর্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে ম্যাকিয়াভেলির রাজনীতি, ধর্ম ও নৈতিকতা সম্পর্কিত মতবাদ আলোচনা করা হলো:
রাজনীতি সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা: ম্যাকিয়াভেলি তাঁর রচনাসমূহে রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা ব্যক্ত করতে গিয়ে রাষ্ট্রের ঐক্য শৃঙ্খলাকে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তৎকালীন সময়ে ইতালির রাজনীতিতে ম্যাকিয়াভেলির প্রধান স্বার্থ ছিল পঞ্চধাবিভক্ত। ইতালিকে ফ্রান্স বা স্পেনের মত ঐক্যবদ্ধ জাতীয় রাষ্ট্রে পরিণত করা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইতালিতে বর্তমানে যে নৈতিক ও সামাজিক অনাচার দৃঢ়মূল হয়ে বসেছে, তাতে একজন পরাক্রমশালী ও নীতিবিজ্ঞান বিবর্জিত রাজার শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ইতালিকে জাতীয় রাষ্ট্রে পরিণত করা আদৌ সম্ভব হবে না। এজন্য তিনি রোমান সিজার বুজিয়ার মত নিরভুশ ক্ষমতার অধিকারী শাসকের সমর্থন করেন এবং অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একজন প্রবল ক্ষমতাসীন রাজার শাসন কায়েম করার কথা বলেছেন। ম্যাকিয়াভেলি নিরঙ্কুশ ক্ষমতার দ্বারা শাসকের বা রাজার কর্তব্য সম্পর্কে কতকগুলো উপদেশ দিয়েছেন এবং রাজার কি কি গুণ থাকা দরকার তার উপর আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে, যেসব নরপতি রাজারা সত্যবাদী নয় এবং সমাজের অপরাপর ব্যক্তিবর্গের চেয়ে অধিকতর ধূর্ত, তারাই কেবল মহৎ কর্ম সম্পাদন করতে সক্ষম। ম্যাকিয়াভেলি ইতিহাস থেকে উপাদান সংগ্রহ করে বলেছেন, “অতীতে কোন শাসকই কেবল আইনকে আশ্রয় করে সফল হতে পারে নি। সুতরাং পশুজগতে যেসব পথ অনুসৃত হয় শাসককেও সেসব পথ অনুসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে দ্বিধা বা সঙ্কোচ ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত টেনে ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, “A prince must know how to use both nature and that the one without the order is not durable.”
নীতিস্বাতন্ত্র্যকে রাজনীতির সাথে সম্পর্কযুক্ত করতে চান নি বলে ম্যাকিয়াভেলি প্রস্তাব দিয়েছেন যে, রাজকুমারের পক্ষে বিশ্বস্ত হওয়ার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। মানুষের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, মানুষ ভালো নয় বলে শাসকও ভালো হতে পারে না। দুষ্টের দমনের জন্য রাজপুত্র বা শাসককে নিষ্ঠুরতা ও ছলনা-শঠতার আশ্রয় নিতে হবে। এর মধ্যে অন্যায় অবিচার বলে কিছু নেই। বরং শঠতার আশ্রয় নেয়াকে তিনি বিচক্ষণতার পরিচায়ক বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, “A prudent ruler ought not to keep faith when by so doing it would be against his interests, ম্যাকিয়াভেলির মতানুসারে রাষ্ট্র যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ব্যক্তির অস্তিত্ব কখনো অক্ষুন্ন থাকতে পারে না। তাই রাষ্ট্রের সংকটাপন্ন অবস্থায় ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্ম ইত্যাদি বিচারবিবেচনা করার কোন অবকাশ থাকে না। চরম অধার্মিক কাজও তখন গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসিত হবে।
ধর্ম ও নৈতিকতা সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা: ম্যাকিয়াভেলি ধর্ম ও নৈতিকতা সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন তার সবগুলোই তিনি শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজ্য বা শাসক শ্রেণিকে লক্ষ্য করেই। তাঁর দর্শনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। তিনি মনে করেছেন, একমাত্র নিরডুশ ক্ষমতাধারী রাজাই ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য নিরাপত্তা ও সম্প্রসারণের জন্য যা কিছু করা দরকার একজন শাসক তা করবে। এজন্য শাসককে সিংহের ন্যায় তেজস্বী ও শৃগালের ন্যায় ধূর্ত হতে হবে। তাঁর ভাষায়, “One (prince) must be a fox to recognise traps and lion to frighten wolves.”
ম্যাকিয়াভেলি মনে করেন যে, ধর্ম ও নৈতিকতার পথ অনুসরণ করে রাষ্ট্র যদি তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে তবে তা হবে সর্বাপেক্ষা উত্তম। কিন্তু মানুষ যেহেতু প্রকৃতিগতভাবে দুর্নীতিপরায়ণ, প্রতারক, লোভী ও হিংসুটে কাজেই এ পথে চলে রাষ্ট্র কোনদিন উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারবে না। প্রতি পদক্ষেপে তাকে বাধাগ্রস্ত হতে হবে। সুতরাং ধর্ম ও নৈতিকতার কথা আদৌ চিন্তা না করে রাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য যা কিছু অনুকূল তাই করে যাবে। তাঁর মতে, রাষ্ট্র যদি চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে পারে তবে মাধ্যম যতই নিচ ও ঘৃণ্য হোক না কেন অর্জিত সাফল্যই মাধ্যমের যৌক্তিকতা প্রমাণ করবে। বস্তুত তিনি বিশ্বাস করতেন যে, “End justifies the means not means the end.”
ম্যাকিয়াভেলি মানুষের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে রাষ্ট্রের অনুগত করার জন্য বল প্রয়োগের মাধ্যমে তার অন্তরে ভীতি সঞ্চারের উপর যদিও সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন, তথাপিও তিনি স্বীকার করেন যে, শুধু বল প্রয়োগের মাধ্যমে আনুগত্য আদায় করা সম্ভব নয়। এমনও হতে পারে আইনের কড়াকড়ি বিশেষ কাজে আসে না বরং তা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে। এমতাবস্থায় শাসকের যা প্রয়োজন তা হলো “ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নিজের কার্যসিদ্ধি করা। শাসক আন্তরিকতা, সততা, মানবতা ও ধার্মিকতার পুরা ভান করবে।”
উপসংহার: ম্যাকিয়াভেলিবাদ যতই সমালোচিত এবং নিন্দিত হোক না কেন যুগে যুগে এর গুরুত্ব অপরীসীম এবং বর্তমানে রাজনীতিতে এর গুরুত্ব অনেক।