জন লক সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথম প্রবক্তা তার তত্ত্বের ভিত্তিতে আলোচনা কর।

অথবা, জন লককে সংসদীয় গণতন্ত্রের জনক বলা হয় কেন? আলোচনা কর।

অথবা, তুমি কি মনে কর যে, জন লক সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথম প্রবক্তা?

অথবা, জন লক কি সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথম প্রবক্তা? তোমার বক্তব্যের সপক্ষে লিখ।

উত্তরঃ ভূমিকা: John Locke সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথম প্রবক্তা। তিনিই প্রথম রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র অমর ও অক্ষয় এবং সরকারের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। তিনি জনগণের হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা প্রদান করার পক্ষপাতী। বর্তমান রাজনীতির ভিত্তি স্থাপিত হয় John Locke এর হাত ধরেই।

John Locke সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথম প্রবক্তা নিয়ে তাঁর গণতান্ত্রিক মতবাদগুলো আলোচনা করা হলো:

১. সরকার গঠনে: Locke অধিকাংশ জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে সরকার গঠনের এবং জনগণের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা প্রদানের পক্ষে। এতে তিনি আধুনিক গণতন্ত্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য গণনির্বাচনের কথা বলে গেছেন।

২. শাসনব্যবস্থা: Locke স্বৈরাচারী শাসনের অবসান চেয়েছেন। তাঁর শাসনব্যবস্থা গণনিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা। তিনি জনগণের সম্মতি ও জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত করে নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রকে অত্যন্ত মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

৩. শাসন ও আইন বিভাগের কার্যাবলি: লকের মতে, শাসনব্যবস্থায় আইন বিভাগের ক্ষমতার স্থানই সর্বোচ্চ। তিনি শাসন বিভাগের ভূমিকাও এক্ষেত্রে স্বীকার করেছেন। তবে এ বিভাগের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। তিনি এভাবে আইন বিভাগের কাছে শাসন বিভাগকে দায়ী করে আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথম পথিকৃতের গৌরব অর্জন করেন।

৪. ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি: Locke ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি আইন, শাসন ও বিচার-সরকারের এ তিনটি বিভাগের কাজকে আলাদা আলাদা করে ভাগ করেছেন যেন ক্ষমতার অপপ্রয়োগ না হয় বা কারও স্বার্থ চরিতার্থ না হয়।

৫. জনগণের অধিকার: John Locke মানুষের জীবনে স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন।
লকের মতে, প্রকৃতির আইন অনুযায়ী সকল মানুষ সমান ও স্বাধীন। তাই সবাইকে সমান অধিকার ও নিরাপত্তা দিতে হবে।

৬. প্রাকৃতিক অধিকার: জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকারকে তিনি মানুষের একান্ত প্রয়োজনীয় অধিকার বলে মনে করেন। এ প্রাকৃতিক অধিকারগুলো জনগণের তথা সমাজের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য।

৭. সম্পত্তি: Locke এর মতে, জনগণের সম্পত্তির অধিকার একটি প্রাকৃতিক অধিকার। তিনি তাঁর সম্পত্তি তত্ত্বের মাধ্যমে সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

৮. গণসার্বভৌমত্বের স্রষ্টা: Locke জনগণের সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস স্থাপন করে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। রাষ্ট্রপরিচালনার সার্বভৌম ক্ষমতা তিনি জনগণের হাতেই দিতে চেয়েছিলেন।

৯. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী: জন লক একজন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাসী দার্শনিক। তাঁর সমস্ত চিন্তাচেতনা ব্যক্তির অধিকার, স্বার্থ ও ব্যক্তির স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে।

১০. ধর্ম ও নৈতিকতার ব্যাপারে সহনশীল: ধর্ম ও নৈতিকতার ব্যাপারে রাষ্ট্র বা অন্য যে কারও হস্তক্ষেপ তিনি পছন্দ করতেন না।

১১. রাষ্ট্রচিন্তায় তাঁর প্রভাব: Locke এর ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ তত্ত্ব গণতান্ত্রিক আদর্শ, সম্পত্তি তত্ত্ব, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও সম্মতিতত্ত্ব পরবর্তীতে বহু বিখ্যাত দার্শনিক ও রাজনৈতিক ঘটনাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। তাঁরা এর বিচার বিশ্লেষণ করেছেন, নতুন নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

মূল্যায়ন: Locke এর রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা ও দর্শন গণতন্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনিই প্রথম সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনের উপর আলোকপাত করেন। তবে তিনি সংখ্যালঘুর মতকেও অস্বীকার করেন নি।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, যথেষ্ট সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রদর্শনে John Locke এর অবদান অনস্বীকার্য। Locke এর নিয়মতান্ত্রিক সরকার, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন ও জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা আধুনিক গণতন্ত্রের পথকে প্রশস্ত করেছে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন গণতন্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনিই প্রথম গণতন্ত্রের ধারণা নিয়ে আসেন এবং এর উপর বিস্তারিত আলোচনা করেন, যা পরবর্তীকালের রাজনীতিতে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। John Locke re তাই সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রথম প্রবক্তা বা জনক বলা হয়।