অথবা, জন লক কে ছিলেন? জন লককে কেন আধুনিক গণতন্ত্রের জনক বলা হয়?
অথবা,”জন লকই আধুনিক গণতন্ত্রের পথিকৃত”-উক্তিটি বিশ্লেষণ কর।
অথবা, জন লককে কেন আধুনিক গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলা হয়?
অথবা,জন লক কি আধুনিক গণতন্ত্রের পথিকৃত? আলোচনা কর।
উত্তর: ভূমিকা আবহমান কাল থেকে এ পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চিন্তাবিদের আগমন হয়েছে। যাদের চিন্তাধারা বর্তমান বিশ্বেও প্রতিফলিত হচ্ছে জন লক তাদেরই একজন। তাকে ব্রিটেনের সংসদীয় সার্বভৌমত্বের পুরোধা বলে আখ্যায়িত করা হয়) শাসন করার অধিকার জন্মলাভ করে শাসিতের সম্মতির মাধ্যমে। এ সত্যকে তিনি চরম সত্য বলে গ্রহণ করেন এবং স্বৈরাচারকে অন্যায় ও অবৈধ বলে ঘোষণা করেন। মূলত এটিই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথা।
জন লক এর পরিচয়: ডান লক ১৬৩২ সালের ২৯ আগস্ট ইংল্যান্ডের সমারসেট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। লকের পিতা ছিলেন একজন আইনজীবী। লক ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে লক তাঁর স্নেহময়ী মাতাকে হারান এবং বন্ধুভাবাপন্ন পিতার স্নেহ, মায়ামমতায় লালিতপালিত হয়ে যৌবনে পদার্পণ করেন।
জন লককে আধুনিক গণতন্ত্রের জনক বলার কারণ: লেকের রাজনৈতিক দর্শন ছিল গণতান্ত্রিক। তাঁর বিভিন্ন মতবাদের মধ্যে আধুনিক গণতন্ত্রের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। তাঁর গণতান্ত্রিক সচেতনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা বোধ, নিয়মতান্ত্রিকতা, সরকারের চেতনা ইত্যাদি ধারণা এক নবদিগন্তের সূচনা করে ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের গৌরবময় সোনালি বিপ্লবে রাজার স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে সাংবিধানিকতাবাদের বীজ বপন করে, তাঁর গ্রন্থ ‘Two Treatises on Civil Government’ রচনা করেন (তাঁকে যেসব কারণে আধুনিক গণতন্ত্রের জনক বলা হয়, নিম্নে তা আলোচনা করা হলো:
১. পণতান্ত্রিক সরকার বা জনগণের সার্বভৌমত্ব: জন লকই প্রথম রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, যিনি সরকারের সার্বভৌম ক্ষমতা সীমিত করে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন মনে করেছেন। জন লকের সামাজিক চুক্তিতে, রাজা বা শাসকের স্বৈরাচারী হওয়ার কোন উপায় নেই। তিনি কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টির হাতে ক্ষমতা অর্পণ না করে গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছেন। এমনকি গণস্বার্থ বিরোধী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকার তিনি জনগণকে দিয়েছেন। এভাবে তিনি জনগণকে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে গণসার্বভৌমত্বের ধারণা সৃষ্টি করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, “Democracy must be institutionalised for establishment of commoners rights and ensure a responsible government.”
২. জনগণ সরকারি ক্ষমতার উৎস: জন লক মনে করেন, সকল সরকারি ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে জনগণ। তিনি বলেছেন, সরকার হল একটা ন্যাসিক শক্তি, এরা কেবল দায়িত্ব পালন করে যাবে এবং বিধিনিষেধের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে। জন লক মনে করতেন, সরকারকে যদি চুক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করা হয়, তাহলে সরকারের আলাদা একটি স্বাধীন সত্তার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। ফলে সরকারের উপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ অনেকখানি শিথিল হয়ে পড়বে। তাই তিনি সরকারের উপর জনগণের নিয়ন্ত্রণকে ছিদ্রহীন করার জন্য ন্যাসিক শক্তির প্রস্তাব দিয়ে গেছেন।
৩. সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক: তিনি সর্বপ্রথম রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র অক্ষয় ও অমর, কিন্তু সরকারের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। এ সূত্রেই বর্তমান রাজনীতির ভিত্তি পত্তন করতে সহায়ক হয়। তাই তাঁকে বলা হয় সংসদীয় গণতন্ত্রের উদ্যেক্তা। তিনি আইন পরিষদকে সার্বভৌম হিসেবে বর্ণনা করেন। আইন পরিষদের দায়িত্ব সম্বন্ধে জন লক বলেছেন, “It is not can possibility be, absolutely arbitrary over the lives and properties of the people.” আইন পরিষদের সার্বভৌমত্বই ব্রিটেনের শাসনতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পথ রচনা করে।
৪. সরকারের ক্ষমতা সীমিতকরণ: লকের মতে, মানুষের প্রাকৃতিক অধিকারসমূহকে অধিক মাত্রায় বিকশিত করান এবং পূর্ণরূপে সংরক্ষণ করার জন্যই সরকার বিদ্যমান। কোন সরকার যদি উক্ত অধিকারসমূহ সংরক্ষণে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় তাহলে জনগণ উক্ত সরকারকে উৎখাত করে সরকারের ক্ষমতা স্বহস্তে গ্রহণ করতে পারে। কাজেই লক সরকারের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে গণতন্ত্রের ধারণাকে সমুন্নত করেছেন।
৫. সরকার গঠনে গুরুত্ব: সরকার গঠনের উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেছেন, অধিকাংশ লোক একবার সরকার গঠনে সম্মত হলে সমাজের সমস্ত ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবে তাদের উপর ন্যস্ত হয়। এভাবে তিনি আধুনিক গণতন্ত্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য গণনির্বাচনের পক্ষে মত ব্যক্ত করে রাজনৈতিক প্রতিভার এক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
৬. ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি: গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার যে বৈশিষ্ট্য তা হচ্ছে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি। যদিও মন্টেস্কুকে এ নীতির প্রবর্তক বলে আখ্যায়িত করা হয়, তবু আমরা যদি একটু গভীরভাবে জন লক এপ রাষ্ট্রচিন্তা পর্যালোচনা করি তবে দেখতে পাই যে, মন্টেফু জন লকের দ্বারাই ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। জন লক ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সুসংহত করার জন্যই এ নীতির আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। জন লক মনে করেন, মানুষ একই সাথে যদি আইন প্রণয়ন ও আইন বলবৎ করার ক্ষমতা লাভ করে, তাহলে মানব চরিত্রের স্বাভাবিক দুর্বলতার কারণে এ ক্ষমতাকে নিজ স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা দেখা দিবে।
৭. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য পথিকৃৎ: তিনি ছিলেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীর অন্যতম পথিকৃৎ। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী হিসেবে জন লকের নাম টমাস হক্সের সাথে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়ে থাকে। ব্যক্তির অধিকার ও স্বার্থকে তিনি মূখ্য স্থান দিয়েছেন। হবস্ যেখানে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিয়েছেন, লক সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণের জন্য এবং সীমিত সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য মত প্রকাশ করেছেন। তবে হক্সের মত লকও ব্যক্তির মঙ্গল ও কল্যাণ সাধনের মাধ্যম হিসেবে রাষ্ট্রকে দেখিয়েছেন।
৮. আইন বিভাগের শ্রেষ্ঠত্ব: সরকারের তিনটি বিভাগের মধ্যে লক আইন বিভাগকে অধিক প্রাধান্য দিয়েছেন। আইন পরিষদকে সার্বভৌম হিসেবে বর্ণনা করে তিনি শাসন বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আইনসভার হাতে ন্যস্ত করেছেন। আধুনিক দায়িত্বশীল সরকারের তিনিই প্রতিষ্ঠাতা। এভাবে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক হিসেবে তিনি রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন।
৯. সম্পত্তিতত্ত্ব: সম্পত্তির অধিকারকে লক প্রকৃত অধিকার অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র বলে ঘোষণা করেন। সম্পত্তির মাধ্যমে ব্যক্তির পরিচিতি প্রসারিত হয়। সম্পত্তিতত্ত্ব সম্পর্কে গেটেল বলেছেন, “Property came first and was the most important locke believed that the right of property include the right of a man to his person and this was the basis of his life and liberty.”
১০. সংসদীয় সার্বভৌমত্ব: জন লক সংসদীয় সার্বভৌমত্বের পক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মতে, আইন বিভাগের ক্ষমতা চূড়ান্ত। আইন বিভাগের সার্বভৌমত্ব আধুনিক গণতন্ত্রের কার্যকারিতার জন্য আবশ্যক।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, জন লক রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে যে স্থায়ী অবদান রেখেছেন তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার স্বীকৃতি দান করেছেন। যে গণতান্ত্রিক আদর্শ তিনি প্রচার করে গেছেন, তার মূল্য অসীম। অধ্যাপক লাস্কি বলেছেন, লক এর গণসম্পত্তি ভিত্তিক শাসন দর্শন ইংল্যান্ডের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এক চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তাঁর অবস্থান স্বমহিমায় উজ্জ্বল একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। Appadorai ও যথার্থই বলেছেন, “Jone Locke made a magnificent role in giving essential for the institutionalization of democracy.”